ফিরে দেখা, আমার ছোটবেলা ।। মমতা দাস










(১)

দুর্গা পুজোর কথা.........পুজোর মজা আমাদের শুরু হত মহালয়ার দিন থেকে। মহালয়ার দিন স্কুলে যেতে হত, পড়া  হত না, কিছুক্ষণ  দিদিদের সঙ্গে  সুন্দর সময় কাটিয়ে  একমাসের লম্বা ছুটি। সেদিন ফুল-মালা-কাগজের রঙ্গিন পতাকা দিয়ে আমরা ক্লাস ঘর সাজাতাম, সে ছিল এক প্রতিযোগিতার ব্যাপার , কাদের ক্লাস সাজানো বেশি ভালো হলো তাই নিয়ে পাল্লা।  তারপর টিচারদের ফুল-মিষ্টি দেওয়া, প্রণাম করা এই কাজ...একমাস যে দেখা হবে না !  যিনি যত প্রিয় টিচার তাঁদের  পাওনার হিসাব তত বেশি । তবে পেতেন সকলেই । তাঁরাও আবার উত্তরে ছাত্রদের মিষ্টি খাওয়াতেন। আনন্দে কাটতো কয়েক ঘণ্টা, কিন্তু সব আনন্দ শেষ হত চোখের জলে ,........একমাস প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে দেখা হবে না যে !

দুর্গা পুজো মানেই তো বাঙালির বিরাট আনন্দের ব্যাপার, তখন-ও ছিল।  আজকালের ঘটা-পটা  ছিল না বটে, কিন্তু আনন্দ ছিল অঢেল ! একমাস আগে বাবার সঙ্গে দলবেঁধে যেতাম কনক বস্ত্রালয়, তখন কাঁদির  সবচেয়ে কুলীন কাপড়ের দোকান।  সানফরাইসড  কাপড়টা ওদের দোকানেই প্রথম চিনেছি।  যাই হোক রং-ছাপা-দাম দেখে কাপড় পছন্দ করা হলো, তারপর দরকার দর্জি । ......দুজন দর্জি বেশি বিখ্যাত ক্ষুদিরামবাবু আর পাঁচু দা।  আমাদের  পছন্দ পাঁচুদা , কারণ  নবীন যুবক, আমাদের পছন্দ জানে, বোঝে ।  ঠিক বানিয়ে দেবে। কিন্তু পাঁচুদার দোষ হল কথা সে ঠিক রাখতে পারে না।  যতই সময় দেওয়া হোক হার সে মানবেই, সময় ঠিক রাখতে পারবনা।  অতএব বাবার মতেই পছন্দ নয় ।  ক্ষুদিরাম বাবু বয়স্ক লোক ,সময়ের ব্যাপারে একেবারে পাক্কা । দেবেন-ই ঠিক সময়ে, বাবার পছন্দ। আমাদের মুখ ভার !শেষ পর্যন্ত অবশ্য আমরাই জিততাম।  পাঁচুদা ভার পেত আমাদের (মেয়েদের ) জামা বানানোর, আর ক্ষুদিরাম বাবুকে ছেলেদের শার্ট-প্যান্টের  ভার দেওয়া হত। তারপর সেই এক-ই ব্যাপার.....ক্ষুদিরাম বাবুর বানান  জিনিস যথা সময়ে ঘরে এলো, কিন্তু আমাদেরগুলো আর পাঁচু দা দিয়ে উঠতে পারে না।  আর বাবার গজর গজর, আমাদের আশংকা শেষ অব্ধি পাওয়া যাবে তো ঠিক সময়ে ?  এইসব করে জামা-কাপড় হয়েই যেত,  তারপর কেনা হত বাটার জুতো,......সে জুতোর প্রথম কদিন স্থান হত আমাদের বালিশের কাছে.....হা হা হা ....শৈশব-কৈশোর কি সুন্দর, সরল !

তখন মহালয়ার দিন থেকেই ঘরে ঘরে মুড়ি-ছোলাভাজা--মুড়কি-নাড়ুর বিপুল সম্ভার মজুত করে রাখা  হত।  যে আসত, তার-ই  জুটত একটা ভাগ ।  আর ছোটদের  তো কথাই নেই, সারাদিন  সব বাড়িতে অবাধ যাতায়াত,খাওয়া ।........'জগতে আনন্দ যজ্ঞে  আমার নিমন্ত্রণ / ধন্য হল ধন্য হল মানব জীবন / নয়ন  আমার রূপের পুরে / সাধ মিটায়ে  বেড়ায়  ঘুরে / শ্রবণ  আমার মধুর সুরে / হয়েছে  মগন'.......তারপর  পুজো কাটলেই শুরু বিজয়া । রক্তের সম্পর্কে  আত্মীয়  কেউ ছিলনা কাঁদিতে , কিন্তু  হৃদয়ের ধন, আত্মার আত্মীয় তো অনেক !....... আরেকটা কথা মনে পড়ল ,বোধ হয় অপ্রাসঙ্গিক  হবে না,......কাঁদিতে আমার মা-বাবার বন্ধু যেসব কায়স্থ পুরুষ-মহিলা  ছিলেন, তাঁরা কিছুতেই  আমাদের প্রণাম নিতেন না, ব্রাহ্মণ  সন্তানদের  প্রণাম নিলে নাকি তাঁদের পাপ হবে !  প্রণাম করতে গেলেই  মেশোমশাই-কাকুরা নমস্কার করতেন, আর মাসিমা-কাকিমারা আদর করে জড়িয়ে বুকে টেনে নিতেন, কি ভালবাসা থাকত সেই আলিঙ্গনে ! ধন্য আমি, কোথাকার কে একটা অন্য জায়গা থেকে বহিরাগত, তবু ভালবাসার ভাগে ফাঁকি পড়িনি......এমন-ই  ছিল  লোকের মন ! বিজয়া চলত  বেশ কিছুদিন ধরে, সে কালী পুজো পর্যন্ত !  মাঝখানে মা লক্ষ্মী এসে একদিনের জন্য দেখা দিয়ে যেতেন ঘরে ঘরে ! কালী পুজোর সন্ধ্যে বেলা প্রদীপ সাজিয়ে, বাজি পুড়িয়ে শুরু পুজোর অপেক্ষার.......সে তো সেই রাত  বারোটায় !  অপেক্ষা করতে করতে  ক্লান্ত,বিধ্বস্ত।  এখন  খেয়াল হচ্ছে যে, কোনদিন আমি কালী পুজোর রাতের পুজো দেখিনি, কোনো স্মৃতি নেই আমার সেই পূজার !  তার মানে অপেক্ষায় ক্লান্ত হয়ে হয়ে একসময় শতরঞ্চি-র উপরেই  ঘুমিয়ে পড়তাম।  বড়রা কেউ সরিয়ে নিয়ে যেতেন, ঘরে শুইয়ে দিতেন । পরদিন প্রসাদ পেতাম । এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে  জেমো  রাজবাড়ির জোড়া কালী  প্রতিমার কথা। কালী পুজোর পরদিন বিসর্জনের প্রতিমা  বেরোত, প্রথমে নগর প্রদক্ষিণ করে, তারপর ময়ূরাক্ষী নদীতে বিসর্জন করা হত । অন্তত কুড়ি ফুট উঁচু ,বিশাল কালো দেবী মূর্তি । আমরা ভয় মিশ্রিত  শ্রদ্ধায় দেখতাম, প্রণাম  করতাম । এই মুহূর্তে মনের চোখে দেখতে পাচ্ছি সেই বিশাল কালী মূর্তি।  মন দেখছি সব স্মৃতি-ই জমা করে  রেখে দেয়, দরকার মত বের করে আনে। কত আনন্দের পসরা  যে জীবন সাজিয়ে রেখেছে স্তরে স্তরে  !  আজ যখন ফিরে দেখছি,মনে হচ্ছে ----"এ জগত মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধূলি ".... আমারই  ভাবনার সঙ্গে তাল রেখে, আকাশে-বাতাসে যেন  বাজছে....."ওং মধুবাতা ঋতায়তে, মধু ক্ষরন্তি  সিন্ধব".......!!!!!

 (২)

আজ অন্যরকম দু-একটা কথা বলি। আমাদের, মানে আমরা আর আমার হবু জীবন সাথী আমাদের খেলাগুলো ছিল অদ্ভুত রকম .... ডিটেকটিভ খেলার কথা তো আগেই বলেছি, কত ক্রাইম যে সলভ করেছি বলার নয় । আমরা গাছে উঠে একরকম খেলা খেলতাম ..ঝালরে ঝুল, এই খেলাতে নিচু নিচু আম-কাঁঠাল গাছে আমরা চড়ে থাকব, আর যে চোর হবে সে নিচে থাকবে ..চারদিকের গাছ থেকে আমরা সব নেমে মাটিতে দাঁড়াব, চোর ছুটে এলেই আবার গাছে, এভাবে যদি যে কোনো একজনকে মাটিতে দাঁড়ানো অবস্থায়  ছুঁয়ে দেয়, তবে সে হবে চোর, খুব মজার খেলা । আরেকটা খেলা ছিল গাছ লাগানো,.....কলেজের গ্রাউন্ডে-ই আমাদের খেলার জায়গা, অনেক সেফ, বেয়ারা রা আমাদের চেনে, ভালবাসে।  শাসন করে..বাবা-মারা নিশ্চিন্ত থাকতেন । দুজন বেয়ারা-র নাম মনে পড়ছে ...রাইপদ দা আর প্রভাকর দা, .....দুজন-ই খুব ভালো, স্নেহ করতেন, আগলেও রাখতেন । যাই হোক, গাছ লাগানো খেলাটা ছিল এইরকম ....তখন নতুন সব বিল্ডিং হচ্ছে কলেজে, তেমনি একটা ছিল বায়োলজি বিল্ডিং, তার পাশে ছিল অনেকটা খালি জায়গা....আমরা অন্য অন্য জায়গা থেকে ছোট্ট ছোট্টচারা গাছ এনে, সেই খালি মাঠটায় লাগাতাম, তারপর রোজ তাদের দেখাশোনা করতাম, জল দিতাম ।......বিল্ডিং হচ্ছে বলে পাশে বড় জলের চৌবাচ্চা তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে ভাঙ্গা  কৌটো করে জল এনে এনে দিতাম । বেশ একটা বাগান তৈরি হয়েছিল সেখানে...আমি কয়েকবছর পর গিয়ে সেই বাগানের দু-চারটি গাছ কে দেখেছি, তারা তখন বেশ বড়, টগরে ফুল আসতে শুরু করেছে, দারুণ লেগেছিল আমার, বহুদিন পর প্রিয়জনকে দেখলে যেমন হয় আর কি ?  আরেকটা বিজ্ঞানের এক্সপেরিমেন্ট-এর কথাও মানে পড়ছে, প্রিয় বন্ধুটি সদ্য স্কুলে পড়েছেন যে সিমেন্টের গুড়োয় জল দিলে সেটা জমে শক্ত হয়ে যায় (আমার থেকে দু-ক্লাস উপরে ছিলেন শ্রীমান, অতএব জ্ঞান ফলাতো খুব ), শুরু হলো এক্সপেরিমেন্ট,.....তখন ইট গুলোর মাঝখানে কোম্পানি-র নাম লেখা থাকত, সেই জায়গাটা বেশ নিচু মতো হত । আমাদের পরীক্ষা তাদের উপরেই, সিমেন্টের একটা পেস্ট বানিয়ে ইটের ওই ফাঁকা জায়গাতে লাগিয়ে দিতাম আমরা, তারপর সাবধানে জলের ভিতরে ডুবিয়ে রাখতাম, রোজ একবার তুলে দেখা হত শক্ত হলো কিনা, তারপর আবার জলে.......কত ইটের যে সলিল সমাধি হয়েছিল, গুনতিতে নেই । একদিন-তো এসব করার সময় আমার পরের বোন জলে পড়ে -ই গেল, তারপর অতিকষ্টে তাকে উদ্ধার করা হয় । এইরকম খেলা আমাদের চলত ৫.৩০ অব্ধি । কেন ? কারণ পাশেই কাঁদির একমাত্র সিনেমাহল, ছায়াপথ। ঠিক সাড়ে পাঁচটায় তারা নানারকম গান বাজানো শুরু করত, শো শুরু না হওয়া পর্যন্ত চলত সেই গান, ......বাংলা, হিন্দি ,ইংরাজি, দারুণ লাগত !  কত গান যে শুনেছি তার ঠিক নেই !  সিনেমা হলের কাছে ছিল কলেজের 'ওয়েস্ট হল '।  তার বারান্দাতে পা ঝুলিয়ে বসে হল-এর দিকে মুখ করে গান শুনতাম আমরা।  শুনতাম না, পান করতাম সঙ্গীত সুধা......তখন থেকেই বোধ হয় গান শোনার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল ।  কত গান যে শুনেছি তখন, দু-একটার কথা এখন-ও মানে আছে ।  কবিগুরু'র  'বিদায় করেছ যারে নয়ন জলে '  যেমন শুনেছি, হিন্দি সিনেমার  "যা শরাবি যা শরাবি, যা যা যা " , আবার  " আমি বনফুল গো" !......গানে প্রচুর বৈচিত্র্য ছিল ।  যারা গান বাজাচ্ছে তাদের এবং যারা শ্রোতা তাদের (ওরা আদৌ জানত কি যে ক্ষুদে কয়েকজন রোজ আগ্রহ নিয়ে, ওদের বাজানো গান শোনে ?) এব্যাপারে কোনো বাছ-বিচার বা  ছুতমার্গ ছিল না !  আমাদের তো নেশা হয়ে গেছিল ওই গান শোনা ।  খেলা শেষে আধ ঘণ্টা গান শুনে, তারপর সন্ধ্যা হওয়ার আগে বাড়ি । ....এই ছিল রোজকার রুটিন ......শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা আমাদের রুটিনের হের-ফের হতনা । একমাত্র শরীর খারাপ হয়ে, খেলতে না গেলে নিয়মের ব্যতিক্রম হত।  আহা হা, কত ভালো গান যে শুনেছি তখন ওই ছায়াপথের কল্যাণে !.....'বঁধু  তোমায় করব রাজা তরুতলে / সিংহাসনে বসাইতে / আসন খানি দেব পেতে / অভিষেক করব তোমার আঁখি জলে'........গান গুলোর অর্থ কি বুঝেছিলাম কিছু সেই বয়সে ? মনে হয় না।  কিন্তু বন্ধুত্বের উষ্ণ পরশ, জীবনের আনন্দ, গান শোনার অপূর্ব অভিজ্ঞতা .......সব মিলিয়ে মনে গেঁথে আছে সেই সুখ-স্মৃতি -------- আজ নাড়া পড়তেই উঠে এসেছে ......সুন্দর সুন্দর !  আরেকটা কথা মনে পড়ল...তখন ছায়াপথ সিনেমায় পনেরই আগস্ট আর ছাব্বিশ জানুয়ারি ভালো দেশাত্মবোধক বা জীবনীমূলক সিনেমা বিনা পয়সায় দেখানো হত, শিবরাত্রির দিন আবার এক টিকিটে দুটো সিনেমা, প্রায় সারা সারা রাত্রিব্যাপী চলত,ব্রতধারীদের জন্য,.....ঐ রাতে ঘুমনো বারণ ছিল, তাই তাঁদের জেগে থাকার সুবিধা করে দেওয়ার জন্য এই ব্যবস্থা.......কতরকম বিবেচনা-ই যে কাজ করত তখন ভাবলে অবাক লাগে !  মানুষের দামটা বোধ হয় বেশী ছিল ব্যবসার থেকে .....এখন শুনলে অবিশ্বাস্য মনে হবে !!!!!!!!

(৩)

প্রত্যেক শীতে আবার সার্কাস  আসত  , ওটা ছিল নিয়ম।  স্কুলের এনুয়াল পরীক্ষা শেষ  হওয়ার আগেই তাঁবু  পড়ত , কি কৌতূহল ! পরীক্ষা  দেব কি , সার্কাস-এর কথা ভেবে  সব  গুবলেট  হওয়ার  যোগাড় !   যাই হোক ,কোনক্রমে  শেষ  তো হত , ব্যস  সন্ধ্যাবেলা  তাঁবু-র আশেপাশে  ঘোরাফেরা ঝপ্পর  ঝপ্পর বাজনা শোনার লোভে , ওই বিশেষ  বাজনাটার-ও একটা বিশেষ  আকর্ষণ ছিল। রাতে  আবার সার্চ  লাইট  ঘুরত শহরের আকাশে।  যাতে বহু দূর দূর গ্রামের লোকেরা দেখে জানতে পারে সার্কাস এসেছে।  আর শহরের মাঝখানে তো রিক্সা করে মাইকে ঘোষণা করতে করতে যেত, আর সঙ্গে  হ্যান্ড বিল  ছড়াত। আমরা বাচ্চারা  হুড়োহুড়ি  করে   সেই হ্যান্ডবিল কুড়াতাম। সকালে আবার তাঁবুর আসে-পাশে , তখন অন্য আকর্ষণ.........খোলা  চোখে জন্তুগুলোকে দেখা।  সকাল বেলা তাদের চান করানো , দলাই-মলাই, খেলার ট্রেনিং করানো, অনেক কিছু দেখা যেত, ......বাচ্চারা দেখছে বলে লোকেরা কিন্তু কিছু বলত না , জানত এতে বাচ্চাদের আকর্ষণ কমবে না, বরং বাড়বে ! একবার আমাদের বাড়ির পাশের বাড়িতে একজন চীনা ভদ্রলোক ভাড়া এলেন ক'দিনের জন্য, তিনি সার্কাস-এর রিং মাস্টার।  আমাদের কি উত্তেজনা, প্রায় আজকালের ফিল্ম স্টার দের দেখে ছেলে-মেয়েদের  যেমন হয় তেমনি ! কদিন পরেই ওদের  সঙ্গে আমাদের খুব ভাব হয়ে গেল, স্ত্রী খুব মোটা  রাজস্থানি মহিলা।  আগে নাকি ওখানেই খেলা দেখাতেন, বয়স এবং মোটা  হয়ে যাওয়ায় এখন  আর পারেন না।  আমরা আন্টি বলতাম।  হিন্দি তো জানি না একটুও, উনিও বাংলা জানেন না, তবুও  কথা ঠিক হত।  মানুষ বোধ হয় মানুষকে বোঝার জন্য সাদা প্রস্তুত  থাকে, তাই দূর বিদেশেও কারো কোনো অসুবিধা হয় না ! ওদের একটা ছোট্ট সুন্দর  মেয়ে ছিল, নাম  'ভিকি'  ভিক্টোরিয়া , খুব মিষ্টি মেয়ে।  কদিনেই আমাদের নয়নের মণি  হয়ে উঠলো  সেই মেয়ে। সক্কালবেলা এসেই আমাদের ঘুম ভাঙানো ওর কাজ।  বসত আমাদের  বুক-পিঠের  উপর চেপে , তারপর চোখের  পাতা গুলো জোর করে খুলে দিত।  আর তার  সঙ্গে আদেশ ...."এই উঠ "  তার  সেই অত্যাচারে না উঠে  আমাদের  উপায়  থকত না ! মার অতি  স্নেহময়ী  স্বভাবের গুনে  পুরো পরিবার আমাদের আপন হয়ে গ্যালো সহজেই , অনেক খাবার-টাবার যেত আমাদের বাড়ি থেকে।  অবশ্য আমরাও পেয়েছি বদলে, ভালবাসা তো বটেই, তা ছাড়া সে বছর আমরা বক্স -এ বসে সার্কাস দেখেছিলাম ,জীবনে প্রথম এবং শেষ, ৬ জন বাচ্চাকে  নিয়ে  বক্স-এ দেখানো কলেজ  মাস্টারের  সাধ্য  ছিলনা। একদিন নয়, ৩/৪ দিন আমরা সার্কাস দেখেছিলাম সেবার। এদের একটা ব্যাপার থাকত, কিছু খেলা রিসার্ভ করা থাকত....জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়ে, ভিড়  কমে এলেই, নতুন দু-একটা খেলা যোগ করা হত, সেবার ঐরকম খেলা যোগ হলেই আঙ্কেল আমাদের নিয়ে যেতেন.........স্বয়ং রিং মাস্টারের গেস্ট, আমাদের খাতির কি ! বক্স-এ বসা, তারপর ইন্টারভ্যাল-এ কেক , শরবত......রাজকীয়  ব্যাপার ! ঝমঝম করে বাজনা শুরু  হলেই রোমাঞ্চ শুরু, শেষ হত বাড়ি আসার পর, মাকে পুরোটা উত্তেজিতভাবে বর্ণনা করার পর।  বেশ কাটল  সেবার একমাস , তারপর এলো সেই ভয়ঙ্কর  দিন.....ভিকিরা  চলে যাচ্ছে , কি মন খারাপ কি মন খারাপ  !  মন বলে "যেতে আমি দেবনা তোমায়"....কিন্তু সেতো হবার নয়.....যেতে দিতেই হয় ! চলে গ্যালো  সার্কাস , পড়ে  থাকলো, সার্কাস-এর তাঁবু পোতার চিহ্ন  আর ওদের ব্যবহার করা দু-একটা ছাড়ানো -ছিটানো জিনিস, ....মন  খারাপ মন খারাপ ! সুখ আনন্দের পাশে কেমন একটু দুঃখের  মিশেল দিয়ে রাখেন  ভগবান,......  ভিকি  দেরকে  ভুলতে পারিনি  বহুদিন , তারপর ধীরে ধীরে  তাও সয়ে গেল। ..............." আমার যে দিন ভেসে গেছে  চোখের জলে "....................!!!!!!

 (৪)


আরেকটা ব্যাপার ছিল যাত্রা। যাত্রা সাধারণত ফসল ওঠার পরে হত। চাষিদের হাতে টাকা আছে, আর ফসল কাটা শেষ কাজেই চাষি ভাইদের হাতে সময়-ও আছে। বর্ধিষ্ণু গ্রাম গুলোর মোড়ল বা জমিদার রা কলকাতা থেকে যাত্রা দল বায়না করে আনতেন, আর দরিদ্র গ্রামগুলি সেটা পারত না বলে নিজেরাই যাত্রাপার্টি বানিয়ে ,যাত্রা করত। আমরা মাস্টার বাবুর (সাধারণ লোক প্রফেসর দের-ও মাস্টার বাবু বলতেন, তা বলে সম্মানের কমতি ছিল না কিন্তু!), বাড়ির লোক বলে সব বিষয়ের মত এ ব্যাপারেও সুবিধা পেতাম। নিমন্ত্রণ করে যেতেন দু-পক্ষই  বাড়িতে এসে। মজার কথা হচ্ছে, দুই দল একটা প্রচ্ছন্ন রেষারেষি থাকলেও যাত্রা-র দিন কিন্তু সব সময় আলাদা হত,......এই শনি-রবি, এই গ্রামে কলকাতার যাত্রা হলে, পরের শনি-রবি হবে ওই গ্রামের নিজস্ব যাত্রা, যাতে কারোর-ই দর্শক কম না হয়! এতটাই তাদের বুদ্ধি-বিবেচনা থাকত। আমরা যেতাম দু-পক্ষের টাই দেখতে। আমার কিন্তু গ্রামের সাধারণ যাত্রা-ই ভালো লাগত! চিরকাল-ই আমার সাধারণ জিনিসগুলো বেশি ভালো লাগে, বেশি দামী, জাঁকজমক-এর জিনিস আমি ভালবাসি না। নিজে সাধারণ বলেই বোধ হয় সাধারণে ঝোঁক! আরো একটা কারণ ছিল মনে হয়, সাধারণ যাত্রা গুলোয় অভিনয় করত আমাদেরই চেনাজানা চাষি ভাইরা, তাই বেশ একটা আপন আপন ভাব মনে আসত। চেনাজানা কি রকম? আগে বলেছি আমাদের একতলা বাড়ির তিন পাশে ছিল খেত, ....ধান-ছোলা--মসুর এসব চাষ হত সারা বছর। চাষি ভাইরা আমাদের হাবুল দা /সুবল দা/পল্টুদা হয়ে যেতেন অচিরেই, বর্ষায় যখন বাড়ি থেকে বেরোনো যেত না, জানালায় বসে বসে ওই অতি প্রিয় দাদাদের সঙ্গে গল্প করে আর ওদের কাজ দেখে কাটত সময়। ওরা মাথায় বেতের একটা তিনকোনা টুপি মতো পরত, তাকে 'টোকা' বলত, আর সারাশরীর খোলা, আদুর গায়ে খেটো ধুতি বা গামছা পরে সারাদিন দাদারা কাজ করত। তারপর ফসল ওঠার পর তারাই যাত্রা দলের  নায়ক-নায়িকা, কি ভালো যে লাগত! দাদাদের ঠিকঠাক মতো চিনতে পারাটা বন্ধুদের মধ্যে চ্যালেঞ্জের ব্যাপার ছিল খুব! সবচেয়ে ভালো লাগত সীতা বা শকুন্তলা যারা সাজত তাদের। কি করে যে চেনা দাদাগুলো একদম মহিলা হয়ে যেত সেটা একটা রহস্য ছিল! আর সেই সুন্দরী মহিলাদের দেখেছি সাজ ঘরের বাইরে দাড়িয়ে বিড়ি খেতে, আসরে ডাক পড় লেই শেষ দু-তিন টান তাড়াতাড়ি দিয়ে,..... "সখা হে"....বলে দুহাত ছড়িয়ে গান গেয়ে, আসরে হাজির হতে। অবাক হয়ে দেখতাম তাদের অভিনয়, নারী সেজে তাদের ভাব-ভঙ্গি, ছলা-কলা, আজ ভাবি, তারা আসলে খুব বড় অভিনেতা ছিলেন, চাকর থেকে রাজা, রাজকুমার, মায়রানী, রাজকুমারী অব্ধি অক্লেশে হতে পারতেন! হেমন্তে নবান্নের পরে শুরু হতো যাত্রা, চলত সেই জানুয়ারি পর্যন্ত। আমাদের দিন কাটতো প্রজাপতির রঙ্গিন পাখায় ভর করে। এইসব যাত্রার অভিনেতারা খুব ভালো গায়ক-ও হতেন অনেকে। বিশেষত 'বিবেক'-এর পার্ট যে করত তার যেমন দাপুটে গলা থাকত, তেমনি দরদি গান! আমরা মোহমুগ্ধ হয়ে দেখতাম এবং শুনতাম। সারারাত ব্যাপী হত যাত্রা, কিন্তু ঘুমের বারণ ছিল চোখের আসে-পাশে আসা। আমার এখনও সেই বয়সে দেখা একটা যাত্রার গান মনে আছে ......"ওগো মোর গুন ধাম, ওগো মোর গুন ধাম/ তুমি যে আমার বর্ষার পরে ফিরে পাওয়া কচি আম "......আহা হা, কি লিরিকস গানের! এখন হলে অবশ্যই হেসে গড়াতাম, কিন্তু তখন নিশ্চয় মন হরণ করেছিল তাই আজ-ও মনে আছে, সেই কথাগুলো! উত্তেজনা তো শুরু হত যাত্রার সেই স্পেশাল ভ্যাপোভ্যাপো বাজনা দিয়ে, চরমে উঠত যখন কোনো সিনের মাঝখানে গেরুয়া বা শাদা পোশাক পরা 'বিবেক' হাত তুলে উদাত্ত কণ্ঠে গাইতে গাইতে ঢুকতেন ....."মন ম-ন রে "অথবা" ওরে পামর, ওরে দুর্জন মানুষ হ রে মানুষ হা"..... আহা হা! এখন যেন কানে বাজছে সেই গান, .......জীবন জীবন রে কত আনন্দের পসরা তুলে দিয়েছ মনের হাতে, ভুলি তার সাধ্য কি ?..............."কি আনন্দ, কি আনন্দ, কি আনন্দ / দিবা রাত্রি নাচে মুক্তি, নাচে বন্ধ।"

SHARE THIS

Author: