একটি পরমাদ ছিল।। পূজা মৈত্র











হাসপাতালের এমার্জেন্সি অপারেশন থিয়েটারের সামনের করিডোরে অস্থিরভাবে পায়চারি করছিল শাক্য ঘড়ি দেখছিল বারবার প্রায় ঘণ্টা-খানেক হয়ে গেল এখনো ড্রেসিং করে উঠতে পারল না? কতগুলো আঘাত ছিল মনে করার চেষ্টা করল শাক্য চার নম্বর ব্রিজের নিচটাতে আবর্জনার স্তূপে পড়ে থাকা অর্ধচেতন নারী দেহটাকে আধো অন্ধকারে দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিল ও চাকরিতে মাস দেড়েক হল জয়েন করেছে বেনিয়াপুকুর থানায় পোস্টিং .এস.আই হিসাবে চাকরি জীবন শুরু করার পর এই প্রথম কোন রেপ কেস ওর হাতে এলো সমস্ত রকমের মানসিক প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও নরপশুদের ভোগ লালসার উচ্ছিষ্ট মাংসপিণ্ডটাকে স্বচক্ষে দেখে মনের মধ্যেটা তেতো হয়ে গিয়েছিল নৃশংসতা পছন্দ করে না শাক্য ব্যক্তিগত জীবনে মার্জিত, ভদ্র যুবক চব্বিশ বছর বয়স কলকাতা ইউনিভার্সিটি থেকে ইতিহাসে অনার্স নিয়ে এম.এ পাশ করেছে গবেষণা করবে ইচ্ছা ছিল,আবার এম.এ পড়তে পড়তে চাকরির পরীক্ষাগুলোও দিচ্ছিল সরকারি চাকরি যখন পেয়ে গেল, যাচা লক্ষ্মী ছাড়তে মানা করেছিল সবাই মা-এরও অমত ছিল না শাক্যর উচ্চতা, ছিপছিপে গড়ন ওর শারীরিক সক্ষমতা সবই এই চাকরির অনুকূল বলে সব বন্ধু বান্ধবরাও মত দিয়েছিল শাক্য নিজের মনের দ্বিধা ভাবটাকে পিছনে ফেলে চাকরিতে ঢুকে গিয়েছিল তাই বীভৎসতার সম্মুখীন হলে ওর শরীরে মনে কি প্রতিক্রিয়া হবে তা নিয়ে নিজেও সন্দিহান ছিল না বেশী ছড়ায়নি শাক্য মুখ ফিরিয়ে নেওয়া অবধিই তারপর মনটাকে শক্ত করেছিল মাথাটার ঝিমঝিমানি, গা গলানো ভাব চেপে কনস্টবলদের আদেশ দিয়েছিল, বডিটাকে রেসকিউ করে চিত্তরঞ্জনে নিয়ে যেতে হাতের কাছে বড় হাসপাতাল বলতে ওটাই আছে একটা স্থানীয় বস্তিবাসী কাগজ কুড়ানি মহিলা ময়লা ফেলতে বাড়ির বাইরে বেরিয়েছিল শীতকাল রাত দুটো নাগাদ বাড়ি থেকে বেরোনোর কারণটা যে ময়লা ফেলা নয়, তা বুঝলেও মহিলাটাকে ঘাঁটায়নি শাক্য গোঙানির আওয়াজটা ও-ই প্রথম শুনতে পায় উৎস সন্ধান করতে গিয়ে একটা আস্ত মেয়েমানুষকে বেআব্রু অবস্থায় ময়লার স্তূপে পড়ে থাকা দেখে যে ও আঁতকে উঠে পালিয়ে যায়নি, এই যথেষ্ট পি.সি.ও থেকে একশো ডায়াল করে পুলিশে খবর দিয়েছিল বাড়ি থেকে নিজের শাড়ি এনে মেয়েটার গায়ে চাপিয়ে দিয়েছিল, লজ্জাটুকু ঢেকেছিল তাতে লালবাজার থেকে ফোন পেয়ে শাক্য যখন উদ্ধার করতে আসে তখন ওকে ঘিরে মানুষের জটলা হয়ে রয়েছে দু চারটে নেড়ি কুকুরও ঘটনাস্থল শুঁকে বেড়াচ্ছে প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে কাগজ কুড়ানিটাকে জিপে তুলে নিতে বলেছিল শাক্য মেয়েটাকে জানার তো উপায় ছিল না ওর কোন জিনিসই ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি, না ব্যাগ, না মোবাইল, না আইডেন্টিটি কার্ড কিভাবে যে ওর বাড়ির লোককে খবর দেবে, ভেবে পাচ্ছিল না শাক্য হাসপাতালে এমার্জেন্সিতে মেয়েটাকে ঢোকালেই প্রথমেই ডাক্তারগুলো চাপ দেবে পুলিশ কেস করার জন্য পুলিশ কেস না হলে ওরা মেয়েটাকে ছোঁবেও না শাক্য মনঃস্থির করে নিয়েছিল ও নিজেই দায়িত্ব নিয়ে সব হ্যাপা সামলাবে সবচেয়ে জরুরি মেয়েটাকে বাঁচানো ও বাঁচলে তবেই না স্কাউন্ড্রেলগুলোকে ধরা যাবে মেয়েটাকে যখন কনস্টবলরা জিপে তুলছে শাক্য এগিয়ে গিয়েছিল রাস্তার নিয়ন আলোয় মেয়েটার দেহের উপরের আঘাতগুলো জরিপ করতে চেয়েছিল ও ভেতরের আঘাতের পরিমাপ করতে যাওয়া মুর্খামি ওটা আর ভরবে না কোনদিন নিয়ন আলোয় মেয়েটার মুখটাকে দেখেছিল ও স্পষ্ট দেখেছিল দেখেই দুপা পিছিয়ে গিয়েছিল টলে গিয়েছিল একটু সুভাষ দা ধরে ফেলেছিল,“কি হল স্যার?” শাক্য কোনক্রমে বলেছিল,“নাথিং কিছু না
-স্যার, চা
সুভাষদার গলা পেয়ে ঘুরে তাকাল শাক্য করিডোরের গ্রিলের সামনে দাঁড়িয়েছিল আকাশে আজ ক্ষয়াটে চাঁদ,কোন রাক্ষস চাঁদটাকে আঁচড়ে কামড়ে খেয়েছে-এমন মনে হচ্ছিল শাক্যর সুভাষদার বয়স বছর আটচল্লিশ কনস্টেবল পোড় খাওয়া লোক শাক্য নিজের অধস্তনদেরও নাম ধরে ডাকা যায় না দাদা বলে নিজের দ্বিগুণ বয়সী কাউকে নাম ধরে ডাকা যায় না,শাক্যর শিক্ষা এটাই বলে সুভাষদা বুঝে গেছে,মেয়েটাকে শাক্য চেনে শাক্য নিজের আচরণেই তা প্রমাণ করে দিয়েছে এমার্জেন্সির ডাক্তার রেজিস্টারে আননোন লেডি লিখতে চেয়েছিল শাক্য থামিয়ে দিয়েছিল,”দ্যুতি,দ্যুতি রায়চৌধুরী চব্বিশ বছর বয়স বাড়ি কৃষ্ণনগর সুভাষদার চোখেমুখে যে অবাকভাব ফুটে উঠেছিল,শাক্য তাকাতেই তা গিলে ফেলেছিল তৎক্ষণাৎ শাক্য চাইলেই অচেনার ভান করতে পারত, লুকাতে পারত যে ও এই ধর্ষিতা মেয়েটাকে চেনে আননোন লেডি হিসাবেই উল্লিখিত হয়ে থাকত, যতক্ষণ না ওর জ্ঞান ফেরে শাক্য কতটুকুই বা চিনত দ্যুতিকে? বড়জোর তিন থেকে চারবার দেখেছে কৃষ্ণনগরে যখন ছুটিতে যেত তখনই দেখা হয়েছে বছর সাতেক আগের কথা সেসব দ্যুতির সাথে ফেসবুকে আলাপ হয়েছিল শাক্যর মায়ের ফ্রেন্ডলিস্টে উজ্জ্বল চোখের মেয়েটাকে দেখে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিয়েছিল তখন ইলেভেনে পড়ে শাক্য কোন মেয়েকে যেচে রিকোয়েস্ট পাঠাত না, কিন্তু দ্যুতিকেই কেন জানে না পাঠিয়ে ফেলেছিল দ্যুতি ওরই মত ইলেভেনে পড়ত শাক্য আর্টস আর দ্যুতি সায়েন্স শাক্যর মা কৃষ্ণনগরেরই মেয়ে মা যে স্কুলে পড়ত, দ্যুতিও সেই স্কুলেরই ছাত্রী সেই জন্যই মায়ের ফ্রেন্ডলিস্টে স্থান পেয়েছিল নিশ্চয় শাক্য ভেবেছিল ডাক্তার শ্রেষ্ঠা সান্যালের ছেলের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পেয়ে লাফাতে লাফাতে অ্যাকসেপ্ট করবে মেয়েটা কোথায় কি? অ্যাকসেপ্ট করার বদলে নাক উঁচু মেয়েটা ফেসবুকে রিপোর্ট করে দিয়েছিল শাক্যর প্রোফাইলটা খুলছিল না আর তখন পুজোর ছুটি ছিল শাক্য কৃষ্ণনগরেই ছিল মায়ের তখন পোস্টিং ছিল ওখানে মা ওখানে থাকত, আর শাক্য থাকত সরিষায় রামকৃষ্ণ মিশনের বোর্ডিং- শাক্যর বাবা ও যখন তিন বছরের তখন মারা যায় বাইক অ্যাকসিডেন্ট হয়েছিল তারপর থেকে শাক্যর জীবনে মা ছাড়া অন্য কারোর তেমন অস্তিত্ব ছিল না মাকে সব কথা বলত ও দ্যুতির কথাও বলে ফেলেছিল
-মা, একটা নাক উঁচু মেয়ের জন্য আমার ফেসবুকটা ঝুলে গেছে
-তাই? ভালোই হয়েছে সারাক্ষণ শুধু মোবাইলে খুটখুট
-সারাক্ষণ খুটখুট করি নাকি? হোস্টেলে কত ডিসিপ্লিন জানো না? সময়ই পাইনা সেই রাতে শুয়ে শুয়ে অল্প একটু ফেসবুক করি তোমার সাথেই তো কথা বলি তাও তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে হয় ভোরে উঠেই স্নান করো,ধুতি পরো,প্রার্থনা করো
-আমি থোড়ি দেখতে যাচ্ছি, আমার সাথে চ্যাট করছিস, নাকি বান্ধবীদের সাথে
মা মুচকি হেসেছিল শাক্যর একটা গার্লফ্রেন্ড হোক, মা খুব করে চাইত ওর লাজুক ভাবটা কাটাতে চাইত মা নিজে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল শাক্যও তেমনটা করুক, আর খুব তাড়াতাড়ি করুক- মায়ের ইচ্ছা ছিল, এখনো আছে যত তাড়াতাড়ি পারে, শাক্যর বিয়ে দিতে চায় মা মামাকে সেদিনও বলছিল, “চাকরি পেয়ে গেছে, এবার বিয়ে দিতে পারলেই আমি ঝাড়া হাত পা দাদা, তুই মেয়ে দেখ বাবুর দ্বারা প্রেম-ট্রেম হবে না, বুঝে গেছি ওকে যত তাড়াতাড়ি পারি কারোর কপালে দিয়ে দিতে চাই আমি আমার কপালটা তো জানিসই, তার উপর এমন চাকরিতে ঢুকেছে- ভয় হয় সবসময়
-বান্ধবী কোথায়? আমার ফ্রেন্ডলিস্ট চেক করো হাতে গুনে কয়েকটা মেয়ে পাবে তাও সব দিদি আর বোন
-তার বেশি তোর মত ক্যাবলাকান্ত ভূতের জুটবেও না তা এই নাক উঁচু মেয়েটা কে শুনি?
-তোমার ফ্রেন্ড তোমাদের স্কুলেই পড়ে দ্যুতি, দ্যুতি রায়চৌধুরী
-, মা? আগে বলবি তো? ঠিক আছে,আমি ওকে বলে দেব, রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দেবে তোকে
-তুমি ওকে পার্সোনালি চেন?
-চিনি, ওদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান আমি ছোট থেকেই চিনি ওকে নাক উঁচু নয় একদম ছেলেমানুষ একটা খামখেয়ালি বলতে পারিস, বলতে পারিস, মুডি একটু, এমনিতে খুব ভালো রাগলে, ওরে বাবা! মা শীতলা একদম যা ঝ্যাঁটায় লোকজনকে...
-ঝ্যাঁটায় মানে?
-দেখতে সুন্দর তো...
-কই? তেমন কিছু না কালো তো
-কালো না, একটু চাপা একমাথা কোঁকড়া চুল, হাসিটাও খুব মিষ্টি ছেলেপিলে প্রপোজ করে, আর উত্তম মধ্যম খায়
-তুমি এত কথা জানলে কই করে?
-আমার খুব ভালো বন্ধু খুব ভালোবাসে আমায় মামনি বলে ডাকে ওর মা, বাবা দুজনেই চাকরি করে ওর স্কুল না থাকলে সারাক্ষণ বাড়িতে একা, এস.এম.এস করবে আমায়, মামনি কি করছ?
শাক্য অবাক হয়েছিল ওর মা অন্য কারোর সাথে এতটা ফ্রাংক হতে পারে ও জানত না
-রীতিমত খুনসুটি করে আমার সাথে
-তোমার সাথে খুনসুটি?
-একদম আমরা একে অপরের লেগপুল করি জানিস বাবু, ওকে দেখলে আমার নিজের ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে যায় আমিও ঠিক ওরই মত ছিলাম ইম্পালসিভ, মুডি, রাগী, জেদি আবার সরল...
মা যে বিশেষণগুলো লুকিয়ে গিয়েছিল শাক্য সেগুলো বুঝতে পেরেছিল দ্যুতি সায়েন্স নিয়ে পড়ে, ইনটেলিজেন্ট, স্মার্ট- শাক্যর মত লাজুক নয় তার উপর দ্যুতি মেয়ে মা মেয়েদের খুব ভালোবাসে শাক্যর মামার মেয়ে পাখিকেও খুব ভালোবাসে মা পাখি দিভাইও পিসিমনি বলতে অজ্ঞান
-অফিসার, পেসেন্টের জ্ঞান ফিরেছে আমরা উন্ডগুলোর ড্রেসিং করে দিয়েছি কপালের কাটাটা গভীর ছিল তিনটে স্টিচ পড়েছে সারা গায়েও অসংখ্য কালশিটে, ছ্যাঁচড়ানোর দাগ...শি ওয়াজ ব্রুটলি রেপড অ্যান্ড বিটেন ব্যাডলি

অপারেশন থিয়েটার থেকে বেরিয়ে ডাক্তার শাক্যকে কথাগুলো বললেন রেপড শব্দটা কানে দিয়ে বিঁধল শাক্যর দ্যুতির এত বড় ক্ষতি হয়ে গেল? এটা তো ও কখনো চায়নি হ্যাঁ, দ্যুতির অহংকারের জন্য ওর সাথে কথা বলে না আর, ওকে রিজেক্ট করেছিল বলে ফেসবুকে ভুলেও কখনও ভালোমন্দটুকুও জিজ্ঞাসা করে না- তবুও ওকে ফলো করে শাক্য প্রোপোজ করে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সাত সাতটা বছর পরেও দ্যুতির আপডেটগুলোয় নজর রাখে সচেতন ভাবে রাখতে চায়না, ওর অবচেতন ওকে দিয়ে নজর করায় দ্যুতি এখন কলকাতায় থাকে, রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ থেকে ফিজিক্স নিয়ে পি.এইচ.ডি করছে, এসবই শাক্যর জানা দ্যুতির বয়ফ্রেন্ডের ছবিটাও দেখেছে কি যেন নাম ছেলেটার- শৌনক, শৌনক গুপ্ত সে-ও পি.এইচ.ডি করে দ্যুতির দুঃসংবাদটা ওর বাড়িতে কি ভাবে জানাবে ভেবে প্রথমে যে দুটো উপায় মাথায় এসেছিল, দুটোকেই বাতিল করেছিল শাক্য মাকে দিয়ে ওর বাড়িতে খবর দেওয়া যায়, মায়ের কাছে দ্যুতির বাবা মায়ের ফোন নম্বর থাকতে পারে-কিন্তু মাকে খবরটা দেওয়া যাবে না মা নিতে পারবে না ফেসবুকে দ্যুতির প্রোফাইল থেকে শৌনকের প্রোফাইলে গিয়ে ইনবক্স করা যায়-কিন্তু একটা অচেনা ছেলেকে কিভাবে বলবে যে তার গার্লফ্রেন্ড রেপড হয়েছে? তার থেকে একটা নিরাপদ পন্থা নিয়েছে শাক্য পাখি দিভাইকে ফোন করেছে ও দ্যুতির ক্লাসমেট ছিল খুব ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিল স্কুলে পড়ার সময় এখন কৃষ্ণনগরেই থাকে ওখানকার কলেজে লেকচারশিপ পেয়েছে পাখি দিভাইকে দিয়ে দ্যুতির বাবা মাকে খবর পাঠিয়েছে শাক্য ধর্ষণের কথাটা না বলে এই বলে খবর পাঠিয়েছে যে দ্যুতিকে অবচেতন অবস্থায় রাস্তার ধারে পড়ে থাকতে পাওয়া গেছে তাতেই ভদ্রলোকের গলা কাঁপছিল শাক্যকে ফোন করেছিলেন এত রাতে ট্রেন নেই বলে গাড়িতেই কলকাতার দিকে রওনা দিয়েছে শাক্য গভীরভাবে শ্বাস নিলো এখানে এসে উনাদের আরো বড় একটা সত্যির মুখোমুখি হতে হবে
-কিছু বয়ান দিয়েছে ভিকটিম, আইসিন কে বা কারা করেছে, কোথায় করেছে?
-না অফিসার ভিকটিম খুব মানসিক যন্ত্রণায় আছে চুপচাপ হয়ে আছে একদম আসলে এই ধরনের ঘটনায় এরকমটাই হয়ে থাকে তা ছাড়া শি ওয়াজ ভার্জিন ফলে ব্লিড করছে খুব, যন্ত্রণাও হচ্ছে......

ভার্জিন! চমকাল শাক্য, কে যেন বলছিল সেদিন দ্যুতি, শৌনকের সাথে লিভ ইন করে?  আকাশ, দ্যুতির ছোটবেলার বন্ধু,আকাশও ক্যালকাটা পুলিশ জয়েন করেছে লিভ ইন শুনে বেশ অবাক হয়েছিল শাক্য দ্যুতি খুব কনজারভেটিভ মেয়ে বলে শাক্যর মনে হয়েছিল অবশ্য সাত বছর বদলে যাওয়ার পক্ষে কম নয়
-আপনি ভিতরে যান, বয়ান নেওয়ার আছে তো এরপর উনাকে আমরা  কেবিনে শিফট করব উনার বাড়ির লোক আসছেন?
-এসে পড়বেন
শাক্য নিজের মনকে প্রস্তুত করল দ্যুতির সাথে মুখোমুখি হতে চেয়েছিল ও ওকে বোঝাতে চেয়েছিল শাক্যকে ও বুঝেছে এতদিন শাক্যর মাকে ভুল বুঝেছে তবে মুখোমুখিটা যে এই রকম পরিস্থিতিতে হতে হবে, কোনদিন ভাবেনি

দ্যুতি অপারেশন থিয়েটারের বেডের উপর বসেছিল পা ঝুলিয়ে গায়ে সবুজ গাউন অপারেশন থিয়েটারের পোশাক গ্রুপ ডি স্টাফরা ট্রলি নিয়ে এসেছে ওকে ট্রলিতে চাপিয়ে নিয়ে যাবে মাথাটা ঝিমঝিম করছে দ্যুতির সারা শরীরে যন্ত্রণা হচ্ছে ও এখানে কি করে এলো বুঝতে পারছে না আজ দেবাঞ্জনের বার্থডে পার্টি ছিল বারবিকিউ থেকে বেরোতে বেরোতে বারোটা বেজে গেছিল প্রায় ট্যাক্সি ধরেছিল ফ্ল্যাটে যাবে বলে বেশি দূরে নয়, লেনিন সরণিতেই ওর ফ্ল্যাট একাই থাকে শৌনক থাকে হোস্টেলে ওর ও হোস্টেলে থাকার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু যখন জেঠুর ফ্ল্যাটটা ফাঁকা পরেই আছে তখন না থাকার কিছু নেই শৌনক আজ পার্টিতে যায়নি ওর বাবার শরীর খারাপ বলে বাড়ি গিয়েছিল, চাকদায় ট্যাক্সিতে ওঠার পরপর কিছু হয় নি ড্রাইভার দিব্যি ভালো গাড়ি চালাচ্ছিল হঠাৎ দুটো ছেলে অন্ধকার ফুঁড়ে এসে হাত দেখিয়ে ট্যাক্সি থামায় জোর করে ট্যাক্সির দরজা খুলে উঠে পড়ে ড্রাইভারের কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে দ্যুতির কাছ থেকে একে একে গলার হার,কানের দুল,ঘড়ি,ট্যাব কেড়ে নিয়ে গাড়ি ছোটাতে বলেছিল বাইপাসের দিকে কি হতে পারে আন্দাজ করে দ্যুতি চিৎকার করেছিল,হাত পা ছুঁড়েছিল ট্যাক্সির কাঁচ তুলে দিয়েছিল ওর শক্ত হাতে ওর মুখ চেপে ধরে রেখেছিল একজন ছেলে দুটোই দ্যুতির বয়সী বা একটু বেশি হবে শক্ত সমর্থ চেহারা একজন লম্বা, ফর্সা, বাঁ কানে দুল পরে, বড় বড় চুল আর একজন মাঝারি উচ্চতার, তামাটে রঙ, চওড়া চেহারা,প্রথম জন ড্রাইভারের কপালে ঠেকিয়ে রেখেছিল আর দ্বিতীয়জন দ্যুতির মুখ চেপে ধরেছিল হিন্দিতে কথা বলছিল মুখ দিয়ে মদের গন্ধ বেরচ্ছিল বাইপাসে ট্যাক্সি থামিয়ে দ্যুতিকে নিয়ে নেমে গিয়েছিল ট্যাক্সিওয়ালা প্রাণের ভয়ে ট্যাক্সি নিয়ে পালাতে পারলে বাঁচে, ঊর্ধ্বশ্বাসে পালিয়ে গিয়েছিল দ্যুতির সব প্রতিরোধ ব্যাহত করে ওরা ওদের আস্তানার টেনে নিয়ে গিয়েছিল ওকে ঝুপড়ি মত ঘর একটা অন্ধকার টিমটিম জ্বলছিল ওখানে আরো একজন ছিল তাকে ভালো করে দেখতে পায়নি দ্যুতি শুধু একটি কথা শুনেছিল তার মুখে, “শালো, ক্যায়া মাল লায়া হ্যায়! তবিয়ত হরি কর দি ভীষণ গম্ভীর গলাটা মেঘের মত গর্জে উঠেছিল যেন সেই প্রথম ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তারপর আরো একজন, তারপর আরো এক...মুহুর্মুহু অত্যাচারে জ্ঞান হারিয়েছিল দ্যুতি নাকি ও চেঁচাচ্ছিল বলে মাঝারি উচ্চতার ছেলেটা পিস্তলের বাঁট  দিয়ে ওর মাথায় যে বাড়িটা মেরেছিল তার পরেই...
-তাকান অফিসার এসেছেন বয়ান নেবেন...

সিস্টারের কথায় মুখ তুলে তাকাল দ্যুতি যাকে দেখল তাকে চিনতে ভুল হল না মামনির ছেলে, শাক্য, শাক্য সান্যাল ইউনিফর্ম পরে ওকে অন্যরকম দেখতে লাগছে শাক্য পুলিশ জয়েন করেছে... হ্যাঁ, হ্যাঁ-তাই তো ফেসবুকে দেখেছিল দ্যুতি সাতবছর আগের রোগা, প্যাংলা ছেলেটাকে মনে পড়ে গেল লাজুক ছিল মামনির আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকত আর লুকিয়ে লুকিয়ে দ্যুতিকে দেখত দ্যুতিও মামনির নজর এড়িয়ে দেখত ওকে চোখ দুটো ভারি সুন্দর ছিল ওর গালে হাল্কা দাড়ি রাখত ওর সাথে চ্যাট করতে বেশ লাগত দ্যুতির শাক্য দারুণ কথা বলতে পারত তবে চ্যাটেই সামনাসামনি নয়
-কি করছিস?
-পড়ছি
শাক্যর কথার জবাব দিত দ্যুতি
-কোন সাবজেক্ট? ফিজিক্স?
-অফকোর্স
-ভালো
শাক্যকে একটু টিজ করতে ইচ্ছা করত দ্যুতির
-কে ভালো?
-মানে?
-ফিজিক্স ভালো না আমি ভালো?
শাক্য নিশ্চিত খুশি হত মনে মনে
-ফিজিক্স ভাল,কিন্তু তুই সবচেয়ে ভালো

শাক্যর সাথে ফ্লার্ট করতে করতে ফিজিক্স পড়ত দ্যুতি তখন অন্য কোন ছেলের সাথেই এভাবে কথা বলত না মামনির ছেলে বলেই শাক্যর প্রতি আগ্রহ ছিল ওর মামনি অত নামী, অত ব্রিলিয়ান্ট, অত ভাল-তাই তার ছেলেও ভালো হবে, ভেবেছিল তা বলে শাক্য যে ওকে প্রোপোজ করে ফেলবে, এটা ওর কল্পনার অতীত ছিল শাক্য ভালো, ভালো ছেলে, দেখতে সুন্দর- কিন্তু তা বলে ওর সাথে প্রেম করা যায় না ও আর্টস নিয়ে পড়ে, অ্যাভারেজ ছেলে দ্যুতিদের ফ্যামিলিতে সায়েন্স ছাড়া কেউ মানাবে না তাছাড়া দ্যুতি তখন ভাবত মা, বাবা যাকে দেখে দেবে-তার সাথেই বিয়ে করবে ও একটা চ্যাট উইন্ডো ওর চোখের সামনে খুলে গেল
-আই লাভ ইউ দ্যুতি
-মানে? আই ডোন্ট আমি তোকে বন্ধু ভাবি
-তাতে কি? আমি তো তোকে ভালোবাসি মা-ও তোকে খুব ভালোবাসে মাকে বললে মা তোকে সঙ্গে সঙ্গে মেনে নেবে
-মামনি নেবে কিন্তু আমার বাড়ি থেকে কিছুতেই মানবে না
-কেন? এখনি তো বলছি না আগে পড়েশুনে দাঁড়িয়ে নিই, চাকরি পাই তারপর তোর বাবাকে গিয়ে বলব
-ওসব পরের কথা আমার ওসব ভাবার সময় নেই এখন পড়তে হবে আমায় কেরিয়ারের কথা ভাবতে হবে
-এখন ভাবিস না দশ বছর পরে ভাববি তো? যখন সেটেলড হয়ে যাবি? আমি ওয়েট করব
-দ্যাখ, ছেলেমানুষি করিস না তুই আমার জন্য খমোকা ওয়েট করবি কেন? আমি যখন তোকে ভালোই বাসি না, তখন অন্য কাউকে খুঁজে নে
-অন্য কাউকে তো খুঁজে নিতে পারি, কিন্তু মা? মা যে তোকে খুব ভালোবাসে, একদম নিজের মেয়ের মত করে ভালোবাসে তুই আমাদের ফ্যামিলিতে এলে মা খুব খুশি হবে
-স্টপ ইট শাক্য, ডিস্টার্ব করিস না এখন এসব ভাবার সময় নয়
-ওকে, এখন ডিস্টার্ব করছি না যখন বয়স হবে, তখন ভাবিস আমরা এখন যেমন বন্ধু আছি তেমনি থাকি না হয়

শাক্যর এই কথাটাও রাখতে পারেনি দ্যুতি ওদের মধ্যে আর বন্ধুত্বও নেই তবুও কেন কে জানে শাক্যকে ফেসবুকে ব্লক করে দিতে পারে নি, শাক্য সান্যাল একটা নাম হয়ে ওর ফ্রেন্ডলিস্টে রয়ে গেছে কেন পারে নি কে জানে? মামনির ছেলে বলেই কি? মামনির সাথেও তেমন কন্টাক্ট রাখেনি দ্যুতি মামনি কৃষ্ণনগর থেকে ট্রান্সফার হয়ে কলকাতায় চলে আসার পর বছরে মাত্র দুটো দিন কথা হয়েছে ওদের একটা মামনির জন্মদিনে, একটা দ্যুতির জন্মদিনে দুটো দিন পরপর দ্যুতির জন্মদিনের ঠিক পরের দিনটাই মামনির জন্মদিন কথা বলতে বার্থডে উইশ, তাও ফেসবুকে মামনি এখন খুব নামী মানুষ ডাক্তার হিসাবে বিখ্যাত তো ছিলই এখন খুব ভালো লেখিকা হিসাবেও সবাই চেনে মামনির সাথে সম্পর্কটা সহজ করতে চাইলেও আর পারে না দ্যুতি মামনিকে ভুল বুঝেছিল দ্যুতি সাতবছর পেরিয়ে এসে ওর মনে হয় শাক্যর জন্য নয়, মামনি ওকে এমনিতেই ভালবাসত, কোন রকমের অভিসন্ধিমূলক ছিল না সেই ভালোবাসা
শাক্য চেয়ার টেনে দ্যুতির সামনে বসল দ্যুতির চোখের দিকে তাকাতে পারল না ও অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে কথা বলা শুরু করল দ্যুতি অবাক হল, লজ্জা তো ওর, একান্ত ভাবে ওর-তাহলে শাক্য চোখ মেলাতে পারছেনা কেন?

-আমি শাক্য সান্যাল আপনার কেসের ইনভেস্টিগেটিং অফিসার আপনার বয়ানটা নিতে হবে
শাক্য কাজের কথা বলতে চায় বয়ানটা নিতে হবে মিডিয়া খবর পেয়ে গেছে চ্যানেল ওয়ালারা হসপিটালে ঝাঁপিয়ে পড়ল বলে ওদের হামলা শুরু হওয়ার আগেই দ্যুতির বয়ান নিয়ে ওকে কেবিনে শিফট করতে হবে
-আপনি করে বলাটা জরুরি?
দ্যুতির কথায় অবাক হল শাক্য আড়চোখে তাকাল ওটি সিস্টাররা কান খাড়া করেই বসে আছেন
-অ্যাজ ইউ প্লিজ মিস রায় চৌধুরি
-কোথা থেকে পেলে আমাকে?
-চার নম্বর ব্রিজের নীচে,ময়লার স্তূপে
-এতটা দূর এলাম কি করে? আমাকে তো ওরা বাইপাসে তুলে নিয়ে গিয়েছিল
দ্যুতি বিভ্রান্ত সুরে বলে -ওরা কারা?
-আমি জানি না পার্কস্ট্রীট থেকে ট্যাক্সি ধরে নিজের ফ্ল্যাটে ফিরছিলাম রাস্তায় ওরা...
-এক সেকেন্ড এত রাতে পার্কস্ট্রিটে কি করছিলে?
-দেবাঞ্জনের মানে এক বন্ধুর বার্থডে পার্টি ছিল বারবিকিউ-
- ট্যাক্সির নাম্বারটা দেখেছিলে?
শাক্য দ্যুতির বয়ান নোট করতে করতে কাগজ থেকে চোখ তুলল দ্যুতির মুখের দিকে তাকাল মাথা নিচু করে বসে আছে ওকে সবসময় মাথা উঁচু করেই থাকতে দেখেছে শাক্য ঔদ্ধত্যে গ্রীবা উঁচু করেই থাকত যেন দ্যুতিকে দেখে ধ্বংসস্তূপ মনে হচ্ছে এখন ওর সমস্ত আত্মবিশ্বাস যেন মাটিতে মিশে গেছে সারা গা হাত পায়ে কালশিটে, আঁচড় কামড়ের দাগ স্কাউন্ড্রেলগুলো ছিঁড়ে খেয়েছে ওকে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে ওর গলার স্বরে যন্ত্রণা ফুটে উঠেছে
- তিনজন ছিল বলছ চিনতে পারবে তিনজনকে?
- বার্গলার দুজনকে চিনতে পারব তবে থার্ড ওয়ান...আমি ঠিকভাবে দেখতে পাইনি...অন্ধকার ছিল
-গ্রেট ওদের ছবি আঁকতে আমাদের আর্টিস্টকে হেল্প করলেই হবে
তিনজনই কি, ইউ নো...
  কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারল না শাক্য শালীনতায় বাঁধল এই মেয়েটাকেই তো মা বৌমা করতে চেয়েছিল শাক্যর পছন্দ শুনে মা আনন্দে নেচে উঠেছিল যেন শাক্যর কানে ভাসল, “ঠিক বলেছিস বাবু, মাম ছাড়া কেউ আমাদের ফ্যামিলিতে অ্যাডজাস্ট করতে পারবে না ও তো আমাকেও খুব ভালোবাসে তাই শাশুড়ি-বৌয়ের কোন ইগো ক্ল্যাশ হবে না শাক্যও ঠিক এই কারণেই দ্যুতিকে প্রোপোজ করেছিল ওর মা ভালো থাকবে এতে
-হ্যাঁ, তিনজনেই
দ্যুতি নিচু গলায় বলল এতটাই চাপা স্বরে যে শাক্য ছাড়া কেউ যেন শুনতে না পায় দ্যুতির গলা সবসময় উচ্চগ্রামে শুনে অভ্যস্ত শাক্য ওর রাগ দেখেছে, জেদ দেখেছে,ওকে রাগের মাথায় ভিত্তিহীন কথাবার্তা বলতে শুনেছে, আজ প্রথমবার কাঁদতে দেখল দ্যুতির চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছিল মুক্তোর বিন্দুর মত সেই জলের ফোঁটা শাক্যর মাথায়, কাঁধে এসে পড়ল শাক্য কিছু বলল না হাত বাড়িয়ে চোখদুটো মুছে দিতে মন চাইলেও, সে অধিকার বা যোগ্যতা ওর নেই নিজের স্ট্যাটাসটা ভেবেছিস একবার? তুই আর আমি? কোনদিনও হতে পারে না তোকে আমার পছন্দ নয়, জাস্ট পছন্দ নয় এটা তুই নিজে বোঝ, আর মামনিকেও বোঝা তোর মাকে বল আমাকে ভালবাসার মিথ্যে নাটক যেন না করে সব বুঝি আমি আমাকে এত আদর করা, এত গিফট দেওয়া, এত কেয়ার করার পিছনে ঐ মহিলার কি ইনটেনশন বোঝার মত বড় হয়েছি আমি আই হেট ফেক পিপল টেল হার টু স্টে অ্যাওয়ে সেদিনই নিজের যোগ্যতার ঘাটতি শাক্যর চোখে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল দ্যুতির সাথে জীবনে আর একটাও কথা বলেনি মা-ও সব শুনে নিজেকে দ্যুতির কাছ থেকে সরিয়ে নিয়েছিল শাক্য জানে, মা দ্যুতিকে মন থেকে ভালবাসত কোন রকমেই সেই ভালোবাসা উদ্দেশ্য প্রণোদিত ছিল না শাক্যর মনের কথা মনের কথা জানার পর থেকে শাক্যকে, পাখিদিভাইকে যে যে অকেশনে গিফট কিনে দিত মা-দ্যুতিকেও সেই সেই অকেশনেই গিফট দিত নিজের মেয়ের মত ভালবাসত দ্যুতিকে হয়তো নিজের মেয়ের থেকেও বেশি শাক্য আর দ্যুতির কোন টপিকে ঝগড়া হয়েছে শুনলে সবসময় দ্যুতির পক্ষ নিত শাক্যকে বলত, “মাম তো দেখতেই বড় হয়েছে শুধু এমনিতে ছেলেমানুষ একদম অবুঝ ওর সাথে ঝগড়া করিস না বাবু
-মামনি জানে?
দ্যুতির প্রশ্ন শুনে চমকে উঠল শাক্য মা জানে কি না জিজ্ঞাসা করছে দ্যুতি মা-এর জানা না জানা ওর কাছে ম্যাটার করে নাকি?
-না বলিনি শকটা নিতে পারবে না
-ভালো করেছ
অস্ফুটে বলল দ্যুতি
-তোমার মা, বাবা আসছেন উনাদের জানানো হয়েছে তোমাকে অজ্ঞান অবস্থায় রাস্তায় পাওয়া গিয়েছিল
-আসছে যখন জেনেই যাবে শাক্য, একটা রিকোয়েস্ট করব...
শাক্য আঁচ করতে পারল রিকোয়েস্টটা কি শৌনককে খবর দেওয়ার রিকোয়েস্ট করবে নিশ্চয়
-অফকোর্স তোমার বয়ফ্রেন্ড এর নাম্বার টা দাও... আমি ফোন করছি
-না, আমি তা বলছি না তুমি যখন এই কেসটার আই.-তুমিই পারো ঐ জানোয়ারগুলোকে ধরতে যত তাড়াতাড়ি পারো ওদের ধরবে শাক্য? না হলে ওরা অন্য কত মেয়ের যে... দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে কথাগুলো বলল দ্যুতি

দ্যুতির মুখে এই কথাগুলো শুনবে শাক্য আশা করেনি করতে পারেনি বরাবরই ও আত্মকেন্দ্রিক নিজের বাইরে অন্যের ভালো নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না অপরের ভালোর জন্য শয়তানগুলোকে ধরা দরকার- এ কথা মাথায় এসেছে যখন, তাহলে দ্যুতি পরিণত হয়েছে অনেক আগের মত ছেলেমানুষ নেই আর

-পারব তুমি এ নিয়ে ভেবো না শুধু ওদের ছবিটা ঠিকঠাক তৈরি করে দাও তারপরের কাজটা আমার উপর ছেড়ে দাও

শাক্য দ্যুতির চোখে চোখ রাখল আজ শাক্যর মধ্যকার গ্লানি ওর পিছুটান হল না প্রোপোজ করেছিল দ্যুতিকে সে রিফিউজ করতেই পারে, তার জন্য সারাজীবন ওর সামনে চোর হয়ে থাকার কোন মানে হয় না এই মুহূর্তে শাক্যকে ওর প্রয়োজন, শাক্যকে ও ভরসা করেছে সেই ভরসাটা শাক্য ভাঙতে দেবে না
-এখানে সই করো
বয়ানের কাগজটায় দ্যুতিকে দিয়ে সই করাবে বলে কাগজ আর পেন এগিয়ে দিল শাক্য দ্যুতি সই করতে গেল ওর কবজি দুটোতে লাল দাগ হয়ে রয়েছে ধস্তাধস্তির স্পষ্ট প্রমাণ কাল ওর ফরেনসিক পরীক্ষা হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সব প্রমাণ একত্র করতে চায় শাক্য পেনটা ভালো করে ধরতে পারছিল না দ্যুতি
-ব্যথা লাগছে?
  শাক্যর কথায় জলভরা চোখে তাকাল দ্যুতি ওর চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হওয়ার কাড়নে কি না জানে না ওর কেসের আই.-র চোখেও যেন লাল ভাব দেখল দ্যুতি
-তুমি সইটা করো, আমি ব্যথার ওষুধ নিয়ে আসছি তোমার প্রেসক্রিপশনটা ডাক্তারবাবু আমাকেই দিয়েছেন তোমার বাবা মা আসতে অনেক দেরি, তার আগে ওষুধের একটা ডোজ পরে যাওয়া জরুরি
দ্যুতি কিছু বলল না চুপ করে সইটা করে দিল
শাক্য দ্যুতিকে কেবিনে শিফট করিয়ে ওকে ওষুধ দিয়ে হাসপাতালের গেট পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি ফোনটা রিং করে উঠল ওসি-র ফোন নিশ্চয় এতক্ষণে লালবাজার থেকে ইনফর্মড হয়ে গেছেন, তাছাড়া টিভিতেও ফ্ল্যাশ করছে ফোনটা হাতে নিয়েই চমকাল মা? ঘড়ি দেখলে শাক্য সাড়ে পাঁচটা, এত ভোরে তো মা ওঠে না, তাহলে শরীর খারাপ হল নাকি? ফোনটা ধরল শাক্য
-হ্যালো,
-বাবু, টিভিতে কি দেখাচ্ছে? চার নম্বর ব্রিজের নীচে...
-হ্যাঁ, একটা মেয়েকে পাওয়া গেছে জ্ঞান ছিল না
শাক্য সত্যিটা ঢাকতে চাইল দ্যুতির কথাটা মা জানলে কষ্ট পাবে
-একটা মেয়ে? তুই চিনিস না তাকে?
-শাক্য বুঝল মা জেনে গেছে কি করে জানল? ! পাখি দিভাই নিশ্চয়
-দ্যুতি
-কিছুক্ষণ ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কোন আওয়াজ এলো না শাক্য আশঙ্কিত হল
-মা...
-রেপড?
দীর্ঘশ্বাস ফেলল শাক্য
-হ্যাঁ
-জ্ঞান ফিরেছে?
-হ্যাঁ,খুব ভেঙে পড়েছে কাঁদছে তবে নিঃশব্দে
-কোন ওয়ার্ডে আছে?
-কেন,তুমি আসতে চাও?
-আসব না?
শাক্য এক মুহূর্তে ভাবল মায়ের এখানে আসা কি ঠিক হবে? দ্যুতির ঐ করা অপমানের কথা মা ভুলতে পারে, শাক্য ভোলেনি মায়ের আসার মধ্যেও যদি কোন মতলব খুঁজে পায় দ্যুতি? এটাকেও যদি সহানুভূতির নাটক ভাবে?

-তোমার আসাটা ঠিক হবে না মা আমি তোমার অপমান হোক,চাইব না
-কিন্তু বাবু...মেয়েটা কষ্ট পাচ্ছে যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, অসহনীয় যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে জেনেও...
-মা, তুমি এলে মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়বে ক্যাওস হবে তুমি সেটা চাও?
মাকে যে করেই হোক নিরস্ত্র করতে চাইল শাক্য
-এতে দ্যুতির ক্ষতি হতে পারে ডক্টর শ্রেষ্ঠা সান্যাল এই কেসের ভিক্টিমকে চেনেন জানলে ওর পরিচয় নিয়ে কি পরিমাণ নাড়াঘাঁটা হবে, ভাবতে পারছ?
মা চুপ করে গেল কিছুক্ষণ পর বলল
-ওর বাবা,মা জানে?
-জানে, আসছে পথে আছে
-ওর বয়ফ্রেন্ড?
মা-ও শাক্যর মত নিঃশব্দে দ্যুতিকে ফেসবুকে ফলো করে তাহলে
-জানে না আমি ওকে বলেছিলাম,ফোন করব নাকি, ও কিছু বলল না
-কেসটা তোকেই হ্যান্ডেল করতে হবে?
-হ্যাঁ, আমিই যখন আই....
-বাবু, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ঐ জানোয়ারগুলোকে ধর তুই পারবি শুধু তুইই পারবি
  মায়ের গলায় গর্জন টের পেল শাক্য মা-ও ওকে ভরসা করে, ঠিক যেমন দ্যুতি করে এই দুজনের ভরসাকে কখনও ভাঙতে দেবে না শাক্য
  দ্যুতির মা, বাবাকে দেখে বাজ পড়া নারকেল গাছের মত মনে হচ্ছিল শাক্য ওদের সামনে যেতেই পারছিল না এড়িয়ে এড়িয়েই চলছিল ওদের সাথে কি কথা বলবে? কি ভাবে সান্ত্বনা দেবে? কোন সান্ত্বনাই কি যথেষ্ট হবে? দ্যুতির সহযোগিতায় ছেলে দুটোর স্কেচ করিয়ে নিয়েছে শাক্য সব কটা থানায় ওদের ছবি চলে গেছে ওসি অনিরুদ্ধ ব্যানার্জী উনার সমস্ত সোর্সগুলোকে সক্রিয় করে দিয়েছেন ওদের ধরা পড়া শুধুই সময়ের অপেক্ষা দ্যুতির ফরেনসিক পরীক্ষাও হয়ে গেছে ওর কেবিনে ঢুকব ঢুকব করেও ঢুকতে পারছে না শাক্য খালি হাতে কি করে ঢুকবে? যদি একটা স্কাউন্ড্রেলকেও পাকড়ানো যেত...দ্যুতির বয়ফ্রেন্ডকে এখনো আসতে দেখেনি শাক্য দ্যুতিরা কি ওকে ঘটনাটা জানাবে না? চেপে যাবে? কিন্তু এই যুগে কোন কথা এভাবে চেপে রাখা যায় নাকি? ফোনটা বাজল আবার ওসির ফোন
-ইয়েস স্যার
-ছেলে দুটোর খোঁজ পাওয়া গেছে একজন ইসফাক, দ্বিতীয় জন আফসার দুজনেই তিলজলা এলাকার ছেলে বার্গলার আর কি এদের পাস্ট ক্রিমিনাল রেকর্ড তাই বলে এত বড় অপরাধ এরা প্রথম করল

শাক্যর শরীরের রক্ত-গরম হয়ে উঠল ওদেরকে তুলতে যাবে ও নিজে হাতে তুলতে যাবে
-স্যার,তাহলে আমায় অর্ডার দিন,ওদের তুলে আনি
-তোমাকে কষ্ট করতে হবে না দে আর অ্যারেস্টেড সারা রাত মস্তি করে যে যার বাড়িতেই ঘুমোচ্ছিল, ভেবেছিল মেয়েটা মরে গেছে নিরঞ্জনবাবু গিয়ে তুলে এনেছেন
শাক্য কিছুটা হলেও দমে গেল ও নিজে হাতে ওদের ধরতে চেয়েছিল নিরঞ্জন হালদার বেনিয়াপুকুর থানার মেজবাবু মারাত্মক দক্ষ অফিসার
-আর তৃতীয় জন?
-ওটাই তো দলের পান্ডা ওর নামটা বার করতে হবে নিরঞ্জনবাবু এই কাজটা করবেন, নাকি তুমিই হাতের সুখ টা করে নেবে?
শাক্য বুঝল ওসি ওকে এই সুযোগটা দিতে চান
-আমি আসছি স্যার
শাক্য নিজেকে বশে রাখতে পারেনি ছেলে দুটোকে বেদম মেরেছে মারতে মারতে মেরেই ফেলবে মনে হচ্ছিল ওর ওর গলা পেয়ে থামল
-শাক্য, এনাফ স্টপ ইট
-বাট স্যার...
-স্টপ ইট কাম ডাউন বেরিয়ে এস আমাদের যা চাই, আমরা পেয়ে গেছি আল মামুদের নাম, ঠিকানা, মেয়েটার জিনিসপত্র, টাকা, ট্যাব সব উদ্ধার হয়ে গেছে আল মামুদকে ধরে ফেলব আজই চলো ওদের ছেড়ে দাও মেজর ইনজুরি হলে মিডিয়া এটাকেই ইস্যু করবে

মাথা ঠাণ্ডা করতেই হল শাক্যকে ডিসেম্বরের শীতেও দরদর করে ঘামছে ছেলেটার দিকে তাকাল চোখ মুখের ভূগোল বদলে গেছে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে মনে মনে একটু শান্তি পেল শাক্য দ্যুতিকে ঐ অবস্থায় দেখার পর থেকে মনের মধ্যে একটা আগুন জ্বলছিল যেন! আগুনের আঁচটা একটু হলেও কমেছে,ওদের মেরে
-বসো, চুপ করে বসো একটু
শাক্য বসল ওসি সিগারেট ধরালেন
-দ্যুতি তো মেয়েটার না?
-ইয়েস স্যার
-তোমার পূর্ব পরিচিতা, তাই না?
-হ্যাঁ
-পুরনো ব্যথা?
শাক্য চোখ নামিয়ে নিলো স্যারের চোখকে ফাঁকি দেওয়া মুশকিল
-তেমন কিছু নয়
-কিছু তো বটেই ওর বয়ফ্রেন্ড ফোন করেছিল, ওর ট্যাবে আমি ধরেছিলাম কি নাম বলল, শৌনক শৌনক গুপ্ত সব সত্যি শুনে কেমন ঠাণ্ডা মেরে গেল মালটা ও আর এ মুখো হবে বলে মনে হয় না
-আপনি... আপনি বলে দিলেন?
-কেন? ভুল করেছি?
-না, মানে...
-তোমার লাইনটা ক্লিয়ার করেছি মাত্র
ওসির মুখে প্রশ্রয়ের হাসি ফুটে উঠল আপনি ভুল বুঝলেন স্যার দ্যুতি আমার মায়ের খুব স্নেহের পাত্রী আমি ওকে এই হিসাবেই চিনি এছাড়া ওর প্রতি আমার মনে কোন কিছুই নেই আর এই পরিস্থিতিতে ওকে নিয়ে কোন ছেলে কিছু ভাবতে চাইবে? আমার মনে হয় না

কথাগুলো বলে নিজেই থমকে গেল শাক্য ওসির চোখে ধুলো দেওয়ার জন্য এ কি বলে ফেলল ও? দ্যুতি রেপড হয়েছে বলে কি অচ্ছুত হয়ে গেছে? কতগুলো জানোয়ারের উচ্ছিষ্ট হিসাবেই কি এবার থেকে ওকে দেখবে সমাজ? কেউ কি নিজের বলে ভাবতে পারবে না ওকে? কোনও পুরুষই না? সত্যিই তো,  তাই হবে হয়তো, তাইতো হওয়া উচিৎ শৌনক যদি হাত গুটিয়ে নিতে পারে তাহলে... তাহলে তো...

-এই কথাটা তোমার মুখ থেকে এক্সপেক্ট করিনি ইয়ং ম্যান
ভেবেছিলাম তুমি প্রোগ্রেসিভ মনের ছেলে বিশেষত তোমার মায়ের পরিচয়টা জানি বলেই... এনিওয়েজ নেভার মাইন্ড

ওসি অনিরুদ্ধ ব্যানার্জী দিলখোলা মানুষ উদার মন আর মুখের কোন তফাৎ নেই শাক্যর মুখে কোন কথা যোগাল না নিজের কাছে নিজেই ছোট হয়ে গেল যেন

সন্ধ্যায় দ্যুতির কেবিনে গেলে শাক্য দেখল দ্যুতির চোখদুটোর উজ্জ্বলতা কিছুটা হলেও ফিরে এসেছে ওর মা রয়েছেন ঐ ছেলেগুলোর ধরা পড়ার খবর পেয়েছে মনে হয়
-মা শাক্য সান্যাল আমার কেসের ইনভেস্টিগেটিং অফিসার মামনির ছেলে
দ্যুতির মায়ের মুখটায় মৃদু হাসি ফুটে উঠল যেন
-তুমিই? তোমার কথা অনেক শুনেছি মামের কাছে
-দ্যুতি, ওরা ধরা পড়েছে
-এখানে খোশগল্প করতে আসেনি শাক্য আত্মীয়তা বাড়াতে আসেনি খবরটুকুই দিতে এসেছে শুধু
-জানি থ্যাংকস
-দ্যাট ওয়াজ মাই ডিউটি থ্যাংকস দেওয়ার কিছু নেই এতে তোমাকে হয়ত কাল থানায় যেতে হবে ওদের আইডেন্টিফাই করার জন্য পারবে কি?
-পারব চোখ বুজেও ওদের চিনতে পারব আমি
-ভালো চলি তাহলে...
-মামনি এলো না তো? খুব ব্যস্ত?
শাক্য ম্লান হাসল
-মা আসতে চেয়েছিল আমি আসতে দিই নি তুমি যদি ভুল বোঝো...
- এখনো ক্ষমা করোনি আমায়? আমার ভুল এখন বুঝি আমি...
দ্যুতির মা বুঝলেন শাক্য উনার সামনে অস্বস্তি করছে
-মাম, তোরা কথা বল্ আমি একটু আসছি
  দ্যুতির মা চলে গেলে শাক্য ভাবল ওর কি কিছু বলার আছে? কিছু একটা বলতে চায় ও কিন্তু সেটা কি বুঝতে পারল না দম নিলো একটু-তারপর কেটে কেটে বলল
-না, তোমার ভুল কিসের? আমি তোমার অযোগ্য ছিলাম, আছি, থাকব কিন্তু মাকে ওভাবে না বললেও পারতে মা তোমাকে আমার লাভ ইন্টারেস্ট বলে ভালবাসত না এমনিতেই বাসত যাক, সাত বছরের পুরনো কথা বলে কোন লাভ নেই টেক রেস্ট তাড়াতাড়ি সেরে ওঠো তোমার সেরে ওঠাটা এই কেসের জন্য জরুরি

দ্যুতি কিছু বলার আগেই শাক্য চলে গেল দ্যুতি চেয়ে আটকাতে পারল না মামনি আসবে না মামনি ওকে ক্ষমা করেনি যেমন শৌনক কোন খোঁজ নেই ওর ফোন করলে ফোন ধরছে না দ্যুতি ভাবতেও পারেনি, এমনটা হতে পারে শৌনকে দ্যুতি ভালোবাসে সমস্ত অঙ্ক মিলিয়েই শৌনককে বেছেছে ও শৌনক ব্রিলিয়ান্ট, হ্যান্ডসাম, নরমসরম গোছের ওকে নিজের মনের মত করে ছাঁচে ঢালতে পারে দ্যুতি পোস্ট ডক্টরেট পেয়ে বিদেশে যাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল ওর শৌনকের সূত্রে দ্যুতিও বিদেশে যেতে পারবে বিদেশেই তো যেতে চেয়েছিল ও ওখানেই সেটেলড হতে চেয়েছিল যেমন জেঠুরা আমেরিকায় সেটেলড হেয়েছে ছোট থেকেই বাবা-মা ওর কানে এই মন্ত্রটাই দিয়েছিল যে জেঠুর মত হতে হবে না হলে বংশের নাম থাকবে না নিজের উচ্চাশার বাহন হিসাবে যাকে বেছেছিল সে যে এত ঠুনকো বেরোবে এটা মানতেই কষ্ট হচ্ছিল দ্যুতির শৌনক আসবে না আর ওর বাবা মা আসতে দেবে না পরিত্যক্ত আবর্জনার মত লাগছিল নিজেকে অশুদ্ধ মনে হচ্ছিল বেঁচে থেকে কি হবে, এটাও মনে হচ্ছিল বারবার তবুও মা-বাবার কথা ভেবে বাঁচতে হবে, বাঁচতেই হবে

-মাম
ডাকটা শুনে চমকে উঠল দ্যুতি
-মামনি?
শ্রেষ্ঠা কেবিনে এলো, চেয়ার টেনে দ্যুতির পাশে বসল ওর মাথায় আদরের হাত রাখল
-শরীর কেমন এখন? ব্যথাগুলো কমেছে?

মামনি এমন ভাবে কথাগুলো বলছে যেন কোনকিছুই হয়নি দ্যুতির সাথেও কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি কিংবা দ্যুতি আর মামনির মধ্যে সাতবছর বাক্যালাপ বন্ধ ছিল না
-কম একটু ওরা ধরা পড়েছে মামনি
-জানি বাবু ওদের ছেড়ে দেবেনা, আমি জানতাম
শাক্য তোমায় আসতে দিল?
শ্রেষ্ঠা মৃদু হাসল
-মানা করেছিল বলেছিল তুই যদি অপমান-টপমান করে বসিস আমি ভাবলাম, ধুর! করলে করবে নিজের মেয়েই তো করবে তোকে তো অপর ভাবিনি কখনো রাত করে এলাম মিডিয়ার ভয়ে আমাকে দেখে যদি ভিড় জামায়...

দ্যুতি অঝোরে কেঁদে ফেলল কাঁদছিল ও মনঃপ্রাণ খুলে কাঁদছিল মা-বাবার সামনেও এভাবে কাঁদতে পারেনি সব কষ্ট বইয়ে দিচ্ছিল যেন
-আমি স্যরি মামনি... আমি...
-ওসব কথা থাক না আমি তোকে ভুল বুঝিনি আমারই ভুল ছিল তোকে এত ভালোবাসি যে বাবুকে আর তোকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে ফেলেছিলাম আমারই ভুল...
-মামনি, আমি খুব খারাপ বলো? নোংরা হয়ে গেছি এঁটো হয়ে গেছি কেউ আমায় ভালবাসবে না আর, কেউ কাছে আসবে না দ্যাখো না, শৌনক ফোনই তুলল না...
-কে বলল এসব কথা যার ভালবাসার সে আসবে, ভালবাসবে কুকুরে মানুষকে কামড়াতেই পারে, তার জন্য কুকুরকে মারতে হয় আর মানুষকে চিকিৎসা করতে হয়, তাকে ত্যাগ করতে নেই যে আসেনি জানবি সে ভালোওবাসেনি কোনদিন যে ভালোবাসে সে এগুলোই করবে, আসবেও
-তুমি আসবে তো মামনি? শাক্য যদি আসতে মানা করে...
বিভ্রান্ত গলায় বলল দ্যুতি- শাক্য মানা করবে না কাল রাত থেকে ছেলেটা জল স্পর্শ করেনি ওর থানার ওসি বললেন শাক্য নাকি ঐ ছেলে দুটোকে লকআপে এমন মেরেছে ওরা মরেই যেত বাবুর চোখ দুটো তুই দেখতে পাস না মাম... নাকি দেখেও দেখিস না

শাক্যর চোখ দুটোকে মনে করার চেষ্টা করে দ্যুতি লাল, লাল রঙই তো ছিল ঐ দুটো চোখে কষ্টের রং লাল, যন্ত্রণার রং লাল, চার অক্ষরের একটা শব্দের নামও লাল, লালই তো।।

SHARE THIS

Author: