দীর্ঘ কবিতা • পানিকাউর • হাসান রোবায়েত

দীর্ঘ কবিতা • পানিকাউর • হাসান রোবায়েত






কোথাও অন্ধকার ছুড়ে দেয়
আলকাতরার বহু লীন স্মৃতি, দূরে চিমনির পোড়া নীল, ক্রমার্দ্র ধোঁয়া
ঘুমন্ত বয়লার ঘিরে কালো পোকা
বয়ে যাচ্ছে শরীর, রাত্রির লাশ—বাষ্পের মিথ
তার তামাটে চোখের ভেতর জ্বালায় হু হু গরাদের ফাঁকা সুর

এমন সময়, হে পাখি, পানোখি, কালো মেঘদূত
তুমি—তুমি—তুমি—
বৃষ্টির রাতে
ছায়া-বিদ্যুতে, ঘনলীন তির, শীর্ষে ইলেকট্রনে
বসে থাকো—যেন ইয়াজুজ-মাজুজের সুষুম্না চিরে
এই নদী, খাল, স্ফটিক পানির যত উন্মূল চক্রাবর্ত
ফিরে ফিরে আসে
অনন্ত হাওয়া-বিচ্ছুরিত যে স্বেদ
পাক খায়, দোলে
সেখানে গভীর তারাম-লি আলোর অশ্রু ধরে থাক থাক
রাতের-সোপান পেরিয়ে নামছে এই চরাচরে, তারই তীক্ষ্ণ চূড়াটিতে তুমি
দৈবনখরে ধরে আছো আলো—
দেখছো, পাশার সারি সারি খেত
মানুষের ঘুমে ঢুকে মহিষেরা উড়িয়েছে ধুলা
গানের লুপ্ত সুর তারা খুঁজে খুঁজে হয়রান—
নম্র পাথর ও পাখি, তোমার কালো হর্মের ভেতর বাজছে
অনাদিকালের উনুনের বীথি
ডুবোনৌকার মোনামুনিবন
এমন গভীর তামাটে রাতের সৌর-অন্ধকারে
শুনেছো পানোখি—
শুয়োর...মাদার চোদ বলে বলে কয়েকটা চোর
উন্মাদ খোর
যাচ্ছে কোথায়
ক্রুর শঠতায়
বিস্মরণের এই ফোঁটা ফোঁটা ভিজে বৃষ্টিতে—

নোনতা দুপুর, গাধার সঙ্গে ফিরে আসা তারা
বাস ড্রাইভার—
শনি-রবি-সোম
ভেসে যায় মল, ফাঁপা কন্ডোম
ফিরে ফিরে আসে, পাক খায় আর
এই কানা বুধ, শুক্রের বার—
এমন সময়, ও পাখি, পানোখি, কালো মেঘদূত
তুমি—তুমি—তুমি—
ভিজে ভিজে একা
দাঁড়িয়ে থেকেছো নদীখালবিলে
সূর্যের শত রশ্মি বিফলে
উরু ফাঁক করে ঢুকিয়ে নিয়েছে
শ্রান্ত সন্ধ্যা যেন কবেকার
ঢেকে দিছে গেছে গোধূলির হেম
সব ডুবে যাবে—
শীলিভূত হয়ে জীবাশ্মে, গানে
ওই দূর দূর
চক্রাবর্তে যেখানে বসন্তেরা শুয়ে আছে
নৌকায় খাঁড়িপাড়ে
বিকালের পুঁজ, ঝকঝকে খুঁত, মায়া-শ্লেষ-হাহাকার
আব্বার ভাঙা সাইকেলে বসা পেছনের ক্যারিয়ার—
তবু হে পানোখি
তোমার রয়েছে দিগন্ত উড়বার—
এখানে পচন, কূট মিথ্যা ও বীজানুর অধিকারে
রাত্রি ফুরিয়ে যাচ্ছে বাদামী ভেড়াদের অধিকারে
ফোঁপা কান্নায়, তামাকারবারি, জাতিয়তাবাদী এবং অশোক
গাছটার ডালে
বেওয়ারিশ কেউ, কয়েকটা চোর, লাশ-ব্যবসায়ী
প্রত্যেকে একা
করছিল পান তারার আরক
ছোট ছোট ঢেউ
ঢেউয়ের উপর আলোছায়াময় রাত
মাদী কুকুরের যৌন সে ঘ্রাণ
অন্ধকারের ডাক—
‘এই শাউয়ার চাঁদে এত ফাঁক!’

কী যেন বলছে গভীর আয়েশে বাতাসের দিকে চেয়ে

এমন সময়, ও পাখি, পানোখি, কালো মেঘদূত
তুমি—তুমি—তুমি—
জানো, এ রাতের অবিশ্রান্ত করোটিতে
আমাদের দেখা হবে না কখনো—

সেই বিস্কুট ফ্যাক্টিরি থেকে বৃষ্টির দিনে আসতেছে ঘ্রাণ
অথবা জোছনা পিছে পিছে রাতে
হয়েছে সঙ্গী, কুশারের বন
আব্বা রয়েছে
আর ছোট বোন
আমরা নৌকা তুলেছি ডুবানো
আমাদের ছিল ভুখা পেট, গানও
গেয়েছি সে রাতে, ওপারে মাঝির ডাক নাম গেছি ভুলে
‘আর কতদূর’ বলে ছোট বোন
আব্বা তখন
নৌকার ঘ্রাণ
ছোট সে বোনটি ভাটিয়ালি গান
বহুদূর পথ হেঁটে গেছি ঝরা ধানখেত দিয়ে দূরে
আমাকে ডাকছে মাটিডালিপথ
সাবানের কারখানা—
তুমি হে পানোখি রাতের ডিভানে
আর ফিরে আনিয়ো না
সেইসব নাচ, ডুমুরের সারি, আপাত বিষাদ

ও পাখি, পানোখি, কালো মেঘদূত
তুমি—তুমি—তুমি—

ও পাখি, পানোখি, কালো মেঘদূত
তুমি—তুমি—তুমি—
উড়ে যাও দূরে
যেখানে চাকা হিংসা-বলয়ে ঘুরতেছে ক্রমাগত

জন্মদিনের শুভেচ্ছা সহ হাফিজ রশিদ খান এর কয়েকটি কবিতা

জন্মদিনের শুভেচ্ছা সহ হাফিজ রশিদ খান এর কয়েকটি কবিতা







হাফিজ রশিদ খান
জন্ম : ২৩ জুন ১৯৬১, চট্টগ্রাম।


বিগত শতকের আশির দশক থেকে হাফিজ রশিদ খান বাংলা কবিতার অস্তিত্বে এক জায়মান সত্তা হিশেবে নিজের বিকাশ ঘটিয়েছেন। প্রায় তিন দশকের পথচলায় একটা নিজস্ব কবি ভাষার মিনার গড়ে তুলেছেন নীরবে নিভৃতে। নব্বই দশকের গোড়ার দিক থেকে কাব্যে ও গদ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জাতিসমূহের তৃণমূল সংস্কৃতি ও জীবনাচারকে তার অনন্য ভাষিক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপন করছেন সমান তালে। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত তার 'আদিবাসী কাব্য' বাংলাদেশে তাকে পরিচিতি দেয় আদিবাসী জীবনের প্রথম কাব্যকাররূপে। ভালবাসা-বেদনা-কষ্ট-বিরহ এইসব হৃদয়দ্রাবী অনুভূতি যে কারাে একার সম্পত্তি নয়, সেটা উন্মোচিত হওয়ার এই তো সময় যখন সমস্ত অপেক্ষা কিংবা সংগ্রাম পাশাপাশি জাগিয়ে রাখে এক জাগ্রত চেতনা। বাইরে থেকে দৃষ্টিপাতের বিলাসী ভূমিকায় না থেকে ভেতরের একজন হয়ে ওঠার স্বাক্ষর হাফিজ রশিদ খানের কবিতা।

আজ কবির জন্মদিনে জলফড়িং এ পড়া যাক কয়েকটি কবিতা।

সংখ্যাগুরুর ক্রোধ

ব্যক্তি আর সংস্থা কতো গেল শান্তির সড়ক
তবু কতো ক্ষুদ্রজাতি নত মস্তকে দাঁড়িয়ে আছে
                                                  বুকে নিয়ে কষ্টের নরক

নাফ সীমান্তে রোহিঙ্গা মরে
                   পারমাণবিক আস্ফালনে পৃথিবীটা কাঁপে ডরে

বোমাভর্তি বিমানের কুণ্ডলিত আগুনের জিবে
                    তামিল গ্রামের ঘরে-ঘরে মানুষেরা গেছে নিবে

কুর্দিদের বাসভূমে
              সংখ্যাগুরুর ক্রোধের ধূমে
                    তরুণ কবির শরীর নিথর হয়ে যায়

শাস্তি, থাকে উহা কাহাদের জোব্বার কোনায়...


বাইরে সৌন্দর্য নাইরে

মুগ্ধ হবো বলে তাকিয়ে রয়েছি
                      শ্রীমুখের নন্দনকাননে

চোখ ফেরাবো না আর
                       পুড়িব ভিজিব ওই ঝাউবনে

গগনে-গগনে তুমিই আমার সন্ধ্যাতারা
                         লাল ঠোঁটের আঙিনাজুড়ে সুর
                                   তোলা আমপারা

এই সব দৃশ্যের বাইরে
                           আর কোনো সৌন্দর্য নাইরে...


তারাছার শাদাফুল

তারাছার পথে যারা যায় পাহাড় ডিঙোবে বলে
তাদের ভেতরে দুর্বার আলেকজান্ডারের
                                               অশ্বারোহী বেগ
জ্ঞানদীপ্ত মাহিয়ানের তেজস্বী বৌদ্ধমন
নির্ভীক খালিদ বিন ওয়ালিদের উজ্জ্বল
                                               নিকষিত হৃৎপিণ্ড
ঋষি অরবিন্দের গভীর মেজাজ প্রতিস্থাপিত
                                               প্রত্যেকের চালু করোটিতে

আসলে ওরা তো অলখপিপাসু সূর্যের সন্তান
                           পায়ের প্রবল চাপ পাথরের বুকে
                               ঝরনার স্বচ্ছজলে জীবনের শুদ্ধ তাপ
                                     ঘূর্ণি হাওয়া
উড়ে যাওয়া দিগ্বিবিক

ক্লান্তিহারা সামুরাই দল
                         পাহাড় পেরিয়ে
পাখিদের গান শুনতে-শুনতে এলো
                           জুমঘরে সন্ধ্যার বৈঠকে

ঝোপের সবুজ খোঁপা থেকে
                             শাদাফুল নিয়ে হাতে
                                    দাঁড়ায় সমুখে আদিবাসী নারী

আঁধার তাড়াতে যেনো শক্তিশালী আলোর পেখম...

ও ঝিরিজল মৎস্য দিয়ো

হৃদয় সলতে পাপড়ি মেলো
এখন আলো আসবে অমল হাতের ছোঁয়ায়
লুসাই পাড়ার তস্বী উঠোন
                                মাদুর পাতো
                                       আজকে শীতের
                                                ঠাণ্ডা আমেজ হাওয়ায়...

সেই মেয়েটা মৎস্যপ্রিয়
সন্ধ্যা হলে পিনোনভরা
                         ও ঝিরিজল
                                মৎস্য দিয়ো...

আমি এবং বন্ধু আমার
আরো অনেক টাটকা সখা
শিশির অবগাহন শেষে
খুঁজতে যাবো
বাতুল পথের ঝোপে-ঝোপে
                                লক্ষ-লক্ষ
                                       রাত্রিপোকা...

সকল যুবক-যুবতিগণ আয়ুষ্মতী দেশলাই জ্বেলো...
অ্যালেক্স সিরিজ ।। চঞ্চল মাহমুদ

অ্যালেক্স সিরিজ ।। চঞ্চল মাহমুদ






অ্যালেক্স, আমাদের যে-জীবনের উপর ইউরোপ দাঁড়িয়ে আছে সে-জীবনকে আমরা মৃত ঘোষণা করেছি। ওরা মরা মানুষের শরীরকে নাচের স্কুল ভেবে নাচ শিখছে…

উচ্চতা-বিষয়ক

এই অনুর্বর মাটিতে পাথরের চাষ করে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি অ্যালেক্স। দিন শেষ হয়ে এলে আমরা নাক ডেকে ঘুমাচ্ছি। দূর থেকে কেউ কেউ ভাবছে শুয়োরের খামার জেগে উঠেছে পৃথিবীতে। আমাদের সেইসব তরঙ্গ উৎপাদনের দিন হেঁটে গেছি পাহাড়-ঘেঁষা রাস্তা বেয়ে। আর নিয়মিত পাহাড় ধসে গেছে আমাদের উপর।
অ্যালেক্স, আমরা চাপা পড়ে গেছি উচ্চতার নিচে। 

কার্পেট

অ্যালেক্স, আমাদের চামড়া কার্পেট হয়ে গেছে;
মেদ বিছানো আছে তার নিচে।
সন্ধ্যার পরেও যে-রাজহাঁস ফিরতে পারেনি ঘরে,
সেই রাজহাঁস খুঁজবে মানুষ
আমাদের কার্পেটে হেঁটে …

অ্যালেক্স, তোর ক্ষুধার্ত দাঁত আমাকে রক্তাক্ত করে চলে

অ্যালেক্স, ক্ষুধার্ত বন্ধু আমার, চল ভাত ছিটিয়ে চলি। বেলাভূমিতে পড়ে-থাকা ঝিনুকের মতো ভাতের বদলে ধর্ম কুড়িয়ে আনি। সভ্যতার ভাঙন আমাদের দোরগোড়ায়। চল, ভেঙে যাই, জেগে উঠি অন্য কোথাও সভ্য হয়ে।

অ্যালেক্স, পেটে এক হাত রাখ, অন্য হাত কপালে; পেট আর কপাল কতদূর অ্যালেক্স? মিটারস্কেল আর কম্পাস রক্তাক্ত করে মাপি। ভাগ্যবদল হয় না দেখে জীবন প্রায়ই উঠে আসে চটের ব্যাগে। অন্ধকারে স্বেচ্ছানির্বাসিত হয়ে সভ্যতা পড়ে থাকে পার্কের বেঞ্চিতে।

জেগে ওঠ মানবতা, শুয়োরের বাচ্চার মতো কোলাহল করে। আমার বন্ধুর বিক্ষত হাত কাঁদছে, বিস্রস্ত চুল, ভুরুতে ঘাম, পায়ের কালশিটে নির্মম হয়ে উঠছে ক্ষুধায়, চিৎকার করছে আলজিভ; শুনতে পাসনি?

অ্যালেক্সের হাসিতে ডুবে যাচ্ছে ইউরোপ

মনে পড়ে তখন বিকেলই ছিল। চগোর ওপর দাঁড়িয়ে যতখানি উপরে ওঠা যায়, ঠিক ততখানি উপরে উঠে আমি ঘোষণা করেছিলাম ইউরোপ এখন রাতের উদ্যান। এখানে মানুষ নেই! মানুষের মতো দেখতে কতগুলো ক্যাকটাস আর কিছু বিষাক্ত ফুলে ভরে আছে এ উদ্যান।

ভূমধ্যসাগরের নিচে যে বালিচাপা পড়ে আছে, তারও নিচে চাপা পড়ে গেছে এ অঞ্চলের আদিম-মানুষ-সংস্করণ। আর এতখানি উপরে উঠে এসেও অ্যালেক্স ঘুমিয়ে আছে কবরে। দেখো, কবরও জোনাকির মতো উড়ছে। ও রাত, ও উদ্যান — এই শেষ আলো। দেখে নিতে পারো পথ!

হাসতে হাসতে আমার মেদ কেটে যায়। যে সভ্যতা ডুবে গেছে বালির নিচে, কতদূর পেরিয়ে অ্যালেক্স এসেছে কবরে শুতে! কতদূর পেরিয়ে অ্যালেক্স এসেছে জোনাকি হতে!
জাদুকর, জাদু দ্যাখ এবার —
অ্যালেক্স বিদ্রুপ করে যখন ঘুংরি হাসি দেয়, পাক খেতে খেতে ইউরোপ তলিয়ে যায় আরো একবার অ্যালেক্সের উচ্চতার সমান। অ্যালেক্স, যে-সংগীত কোনোদিনই শুনিনি, সে-সংগীত পাঠ করে চার্চের উঠোনে গড়াগড়ি খাব দু’জন। ঘাসের ভেতর থেকে মাথা জাগিয়ে বলব — আমরা দেখে ফেলেছি চার্চের উঠোনে তোমাদের ডুবে-যাওয়ার দৃশ্য।

পাল খাড়া করে দাও অ্যালেক্স

পৃথিবীর সব মধু খেয়ে অ্যালেক্স যে তীর খাড়া করে দিল বাতাসে, সেই ভাংদ-কে পাল বানিয়ে বয়ে যাচ্ছে সময়।
বোঝোনি নিকোশিয়া!
তোমার চোখে পাল বেঁধে অ্যালেক্স খুঁজেছে এশিয়া।

উর্বর ভূমিতে গানের মৌসুম শেষ হয় নি কখনো

অ্যালেক্স, আমার এখানে ক্ষুধার মৌসুম। আমিও ক্ষুধার্ত। সারাদিন অফিস করে সন্ধ্যার বুকে উঠে হাঁটি। ইদানীং অফিসের সময় এবং অফিস-পরবর্তী সময়কে আমার পাশাপাশি দুটি রাষ্ট্র মনে হচ্ছে। সন্ধ্যাটাকে মনে হয় বর্ডার। অ্যালেক্স, আমি যখন অফিস থেকে বের হই তখন সন্ধ্যারা বর্ডার হয়ে আমার পায়ের কাছে জড়ো হতে থাকে। আমি আলগোছে বর্ডার ক্রস হয়ে স্বজনদের কাছে ফিরি। আমার ক্লান্ত শরীর কলতলায় যায়, কল ছেড়ে হাতে-মুখে পানি ঢেলে নেয়।

অ্যালেক্স, চোখে-মুখে পানি নিতে নিতে মনে হয়, পৃথিবীর নগরপিতারা আমার ক্লান্ত শরীরের উপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুতে দিচ্ছে।

মাথাটা ঝাঁকি দাও রোদেকা

রোদেকা, অ্যালেক্সের হাঁপানি ছিল। অ্যালেক্স হাসি দিলে যে-তরঙ্গ, সে-তরঙ্গের ঝাঁকি পেড়ে আনতো জয়তুন ফলের মাঠ। জয়তুন শীতকালে পাকে। জয়তুনের আচার লবণ-পানির চেয়েও কিছুটা লবণ। লবণ খেলে অ্যালেক্সের হাঁপানি বাড়ে।
রোদেকা, অ্যালেক্স সাঁতার থেকে ঢেউ তুলে বিছানা পেতে ঘুমাত। অ্যালেক্স সাঁতারে যেত।

রোদেকা এখনো আমরা গভীরতায় ডুবে আছি

রোদেকা তুই তো জানিস, পৃথিবী কতখানি দুর্বল। তারও বেশি দুর্বলতা নিয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি তোর পায়ের কাছে এসে। একদিন দুর্বলতা কেটে যাবে, ঘুম ভাঙবে। তোর দু-উরুর মাঝ থেকে টেনে বের করব ধারালো কাঁচি। রোদেকা, দু’জন মিলে আগাছা কেটে ধ্যানের জমি বাড়াব পৃথিবীতে। গুদামজাতকরণ হবে না কোনো বোধের। ভূমির ওপর বিছানো যে দেড়ফিট ভাবের গভীরতা, তা ঠোঁটে নিয়ে বাতাসে ভেসে যাবে কাকাতুয়া।
আর কাক ও শকুনের জন্য পচে উঠবে আগাছার স্তূপ।

সমুদ্র ও উচ্চতা বিষয়ক

রোদেকা, তোমার যৌনাঙ্গে পেতে দাও মই। পিচ্ছিল পথে সাবধানতা নিয়ে একটা উচ্চতা পাক পৃথিবী। মই সহ তুমি ডুবে থাকো উচ্চতার নিচে। হাতে ছাই নিয়ে যত উপরেই উঠে আসুক, অন্য উচ্চতার মানুষ একদিন ঠিকই বুঝে যাবে, তারা বন পুড়িয়ে উঠে এসেছে এখানে। বন মানেই তো সৌখিনলতার ঝোঁপে বাঘ ও দাঁতের হিংস্রতার দিকে খরগোশের এলিয়ে-দেওয়া চোখ ।

এত উঁচুতে হিংস্রতা থাকে না। কিছু অলসতা কাটিয়ে বাতাসে দাগ কাটতে কাটতে হারিয়ে যায় খরগোশ। যেখানে বন নেই, সেখানে বাঘ নেই। সেখানে খরগোশও থাকে না।

রোদেকা, জয়তুনক্ষেতে যে-রোদ জানিয়ে গেল — আধিপত্য অর্জনের কিছু নয়, সে-রোদে আমরা ফেলে দিয়েছিলাম আমাদের খালি-হয়ে-যাওয়া স্যুটকেস আর তোমার কপালের সমান একখানা ভাঙা আয়না।

আহ রোদেকা,
রোদে আয়নায় রপ্ত হলো দিন!
চাপা পড়ে যাও পৃথিবীর শীতকাল। আমরা উষ্ণ হতে থাকি।
মেলায় পাওয়া যাচ্ছে শশী হিমু'র কাব্যগ্রন্থ 'বৃ'

মেলায় পাওয়া যাচ্ছে শশী হিমু'র কাব্যগ্রন্থ 'বৃ'







ছবি:বিশ্বজিৎ দে
বৃ। কবি শশী হিমু'র প্রথম বই। প্রকাশিত হয়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০ এ চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনীর ব্যানারে। দীর্ঘ কবিতা যাপনের পর কবির মনে হলো কিছু কবিতা ছাপাখানায় পাঠানোর এটাই শ্রেষ্ঠ সময়। শশী হিমুর নতুন বই 'বৃ' সম্পর্কে জানতে চাইলে কবি বলেন: 'কবিতার বই বৃ, আড়ালে একটা গল্পের বই।

কখনো কখনো গল্প কবিতার জন্ম দেয়। আবার কখনো কখনো কবিতায় কবিতায় গল্পও গড়ে উঠতে পারে। এই বইটাতে দুটো ব্যাপারই ঘটেছে। বইটির অনেক কবিতাই আছে যা ভিভিন্ন গল্পের কথা বলে। আবার সবগুলো কবিতাও একই সুরে একটা গল্পের উপসংহারের দিকে ছুটে যায়।'

জলফড়িং পাঠকদের জন্য শশী হিমু'র নতুন বই থেকে পাঁচটি কবিতা:

প্রেমিকার সাথে বাক্যালাপ- ১

"তুমি কতো রকম করে চোখে কাজল দিতে পারো?"
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে, সে গুনতে গুনতে
সংখ্যার ক্রম হারিয়ে ফেলে। আঙ্গুলের কর শেষ হয়ে যায়;
তার চোখে যেন বিধাতার প্রিয় সৃষ্টি।

যতবার দেখা হয়েছে ততবারই
তার অনুপম চোখের দিকে প্রথমে তাকিয়েছি।
প্রতিবারই ভিন্নভিন্ন ভাবে কাজল আঁকা চোখ দেখেছি।
এমন কখনো হয়নি তার চোখে কাজল নেই।
যেন তার চোখের বয়স বাড়ে না।

আবারো জিজ্ঞেস করলাম,
"তুমি কতো রকম করে চোখে কাজল দিতে পারো?"
সে কিচ্ছুক্ষণ চুপ করে থাকলো, কিছু বলল না।
আমিও কিছু বললাম না, কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম।
কিছু সময় এভাবে নিশ্চুপ ও নীরবতার সম্মোহনে কেটে গেল।
এরপর শব্দেরা ডানা মেলল তার কণ্ঠে।
পাল্টা প্রশ্নের জানতে চাইলো,
"তুমি কতোগুলো কবিতা লিখেছো আমার জন্য?
সে জানে,
এই প্রশ্নের উত্তরে আমিও গুনতে গুনতে
সংখ্যার ক্রম হারিয়ে ফেলছি,
আঙ্গুলের কর শেষ হয়ে যায় বার বার।
আমার কবিতাই যেন তার প্রিয় সৃষ্টি।

আমি তার নীরবতা কবলিত কবি,
যতবার একসাথে মিশে গেছি নাগরিক বিকেলে
কবিতার আকুতি দেখেছি চোখে চোখ মিলে গেলে
যেন নীরবতায় চেয়ে নেয় অলিখিত ঋণ।
যতবার একসাথে মিশে গেছি নাগরিক বিকেলে
কবিতার হাহাকারে হাত রেখি হৃদয়ের কাছে,
এমন কখনো হয়নি,কবিতা নেই চিরকুটে।

চোখ বুঁজলেই তুমি আমার

হুটহাট কিছু ছবি সামনে চলে আসে।
তোমাকে দেখার জন্য আমার ছবি দরকার হয়না,
স্মৃতির পাতা হাতড়াতে হয়না ক্যালেন্ডার দেখে।
বাসের জানালার ফাঁকে, ছাদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে,
বারান্দার কোলে, খোলা মাঠে, গাছের পাতার ফাঁকে,
সারিসারি নাগরিক কংক্রিটের মাঝে টুকরো টুকরো
আকাশের দিকে তাকালেই তোমার চিহ্ন দেখি ।
বর্ষা হলেই যেন শুধু তোমারই ধূসর আগ্রাসন,
আর শরতদিনে আকাশ হয়ে ওঠে নাগরিক নীলনদ,
চোখ বুজলেও চোখে কেবল তোমার চোখটাই ভাসে;

চোখ বুঁজলেই তুমি আমার।

কবি ও কর্পোরেট দাসত্ব 
আটটা-পাঁচটার রুটিন ছুঁড়ে ফেলে রাস্তায় নামি,
কলারের বোতাম খুলতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে যায়।
বাতাসে তখনো রঙহীন সুর্যোলোক মিলিয়ে যাচ্ছে,
শার্টের হাতার সাথে সাথে গুটিয়ে নেই দাসত্বের ছাপ।
মুঠোফোনে চোখ মেলে দেখি তোমার নির্লিপ্ততার বার্তা,
যান্ত্রিক জীবনের ভিড়েও খুজি তোমার অস্তিত্বের আভাস।
তারপর একটা সন্ধ্যার স্মৃতি পেছন থেকে অনাহুতের মতো
দুহাতে আকড়ে ধরে আমার নির্নিমেষ দুটো চোখ।
আমি একটা লোকাল বাসের জানালা খুঁজতে খুঁজতে,
ইতিহাসের পেছনের চাকায় উঠে যাই। এটোসেটো সিটে
বসে ভাবি, জীবনটা যেন বিরতিহীন পথে লোকাল সার্ভিস।
ইতিহাসের বদ্ধ জানালায় চোখ পড়তেই দেখি নিজের প্রতিবিম্ব,
অপরিচিত যাত্রীরা নেমে গেলে, ব্যক্তিগত সব দুঃখবোধ আর
জীবনের অপূর্ণতা পাশে এসে বসে-একই তো গন্তব্য!
বুকের মধ্যে অক্ষরগুলো মুহুর্মুহু ডানা ঝাপটায়,
কর্পোরেট দাসত্ব অস্বীকার করি কবিতায় কবিতায়।

অভিনয়

তুমি চলে যাবে ভাবতেই আমার দুহাত মুষড়ে পড়ে।
যে হাতে হাতে রেখে তরজমা করেছি যৌথ অনুভূতি,
সে হাত চলে যাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে - ভাবলেই
কবিতাগুলোর জন্য অসহায় লাগে, নতমুখে
চেয়ে থাকি মাটির দিকে নিস্পলক।
তুমিহীনা ভালবাসার মতো এই অনাথ কবিতাগুলো
নিয়ে কোথায় যাব? এই দুশ্চিন্তায় রাতগুলো নির্ঘুম;
বুকের মধ্যে খাঁখাঁ করতে থাকা একটা বিরান জাগে।
তুমি চলে যাবে ভাবতেই আমার নিঃশ্বাসগুলো
সহসাই দীর্ঘশ্বাস হয়ে ওঠে।

যে চোখে চোখ রেখে জেনেছি হৃদয়ে কাকে বলে
সে চোখ আর কোনোদিন দেখবোনা- ভাবলেই
স্মৃতিগুলো সাদাকালো বায়স্কোপের মতো
দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে বারবার অবিরাম অবিরত।
চাঁদের কলঙ্কের মতো আমাদের অতীত নিয়ে
কোথায় যাব? আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করার অভ্যেস
তোমার বুকেও তো জাগাবে ব্যাথার চর, চাঁদ জাগলে!
তোমার অস্তিত্বে আমি বেঁচে থাকার অনন্দ পাই
তুমি চলে গেলে বেঁচে থাকার অভিনয়ে বাঁচি।

বৃ-৫

হিরোশিমা আর নাগাসাকি
হৃদয়ে নিয়ে বিন্দাস ঘুরছি

স্মৃতি

তোমাদের স্মৃতিকাতরতা বড্ড অদূরবর্তী;
বিগত প্রেম, কিম্বা প্রথম প্রেমিকার স্মৃতি হাতরে
সহজেই তোমাদের মাঝে জেগে ওঠে ব্যাথার নদী।
স্মৃতি হাতরে বড়জোর ফিরে যেতে পারো কৈশোরে,
খুব বেশি হলে শৈশবে ফিরে আনন্দ রোমন্থন।
স্মৃতি বলতে আমি ফিরে যাই মাতৃগর্ভে,
ধরিত্রীর বুকে আনন্দ-দুঃখ
কিম্বা পরোকালের স্বর্গ-নরক
কোনটিই আমি অস্বীকার করিনা।
তবুও ওই জঠরকেন্দ্রিক স্মৃতি আমি এড়াতে পারিনা
আমার দুঃখ ছিল না,আনন্দ ছিল না।
ভয় ছিল না, মৃত্যু ছিল না কান্না ছিল না,জীবনের ।
ব্যতিক্রমী কবিতার ওয়ালেট 'দ্বি' এবং 'ত্রৈ'

ব্যতিক্রমী কবিতার ওয়ালেট 'দ্বি' এবং 'ত্রৈ'

ছবি ঋণ: রুবাইয়া তুশমী
গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে গতবছর কবিতার ওয়ালেট 'দ্বি' প্রকাশ করেছিলেন নিজের প্রকাশনি সংস্থা চন্দ্রবিন্দু থেকে। ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পাওয়ার পর এবারের মেলায়ও বের হয় নতুন কবিতার ওয়ালেট 'ত্রৈ'... বলছিলাম কবি চৌধুরী ফাহাদের কথা। তিনি সবুজের কবি। ঝিনুকের মত হয়তো ভেতরে পুষে রাখেন বিষের বালি অথচ কী আনন্দম স্বচ্ছ নির্ভেজাল অভিমান নিয়ে লিখে যাচ্ছেন সময়ের প্রতিচ্ছবি! দ্বি কিংবা ত্রৈ মুলতঃ ছোট কবিতার এক গয়নার বাক্স এর মত। যতই গভীরে যাওয়া যায় যেনো বিষণ্ণতার এক সুখকর বাতাস বয়ে যায়। অনেক কথাকে কবি খুব সহজেই অবলিলায় বলে দিয়েছেন মাত্র কয়েক লাইনে। সহজ কথাকে একটু ঘুরিয়ে বলা, প্রচন্ড জমে থাকা ক্ষোভ অথবা বেদনার কার্নিশে ঝুলে থাকা যাপনের এইসব হাহাকার কখনো কখনো গোপণে অথবা প্রকাশ্যে প্রাচার করে দিয়েছেন মানুষের হৃদয়ে, পাঠকের বোধে।

মানুষ জীবন্ত ঘোড়ার পিঠে চড়তে ভালোবাসে! মৃত প্রায় ঘোড়ার জন্য খড়বিচালি কেউ সংগ্রহ করতে চায় না। কবি বোধহয় বুঝে গিয়েছিলেন সময়ের এই হিংস্র পারাপারে ভেঙ্গে যাচ্ছে আকাশ ছোঁয়ার সাঁকো। তাই সমস্ত রকমের দুঃখ, বেদনা, অভিমান আর সন্ধ্যাতারার গানে রাত খেকোর মত রূপকথা ঢেলে দিয়েছেন নিজের কাব্য জগতে।

ব্যতিক্রমী কবিতার ওয়ালেট 'দ্বি' এবং 'ত্রৈ' সম্পর্কে জানতে চাইলে কবি জলফড়িং কে বলেন: "মানুষ যেতে চায়। নানাদিকেই যেতে চায়। যেখানে শরীর যেতে পারে না, স্নায়ু যায়, কল্পনা যায়। এই যেতে চাওয়া, বারবার নিজের বাইরে চলে যাওয়ার যে তাড়না তার ভেতর থেকে যে বোধ উঠে আসে মূলত তার নির্যাসই হয়ত কবিতা। নিজের বাইরে গিয়ে, নিজের গভীরে গিয়ে যে জলটুকু অবশেষ হিসাবে থেকে যাচ্ছে, সেই জার্নি থেকে সঞ্চিত উপাদান এক করে তারও সারসংক্ষেপ হচ্ছে আমার এই কবিতার কিতাব 'দ্বি' বা 'ত্রৈ', যাকে বলছি কবিতার ওয়ালেট। নির্বোধ সময়কে প্রবোধ দিয়ে ব্যাধি ও বোধের যুগলসন্ধী এই যাত্রা..."

বই দুটি পাওয়া যাচ্ছে:

বাংলা একাডেমি বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে
চন্দ্রবিন্দুর ৬০৭ নং স্টলে,
চট্টগ্রাম বইমেলার চন্দ্রবিন্দু ১২১-১২২,
পাবনা বইমেলা স্টল নং ১৩,
সিলেট বইমেলা, স্টল নং ২৩-২৪,
খুলনা বইমেলা, স্টল নং ৮৬-৮৭,
এবং রকমারি.কম এ এখানে ক্লিক করে
মেলায় পাওয়া যাচ্ছে নৈরিৎ ইমু'র কবিতার বই 'না মর্মরে না মর্সিয়ায়'

মেলায় পাওয়া যাচ্ছে নৈরিৎ ইমু'র কবিতার বই 'না মর্মরে না মর্সিয়ায়'






ছবি: নুরেন দূর্দানী
 নৈরিৎ ইমু'র কবিতা একটি ঘোরের দিকে নিয়ে যায়। পড়তে পড়তে ক্রমশঃ মনে হয় এই বুঝি পাশকেটে চলে যাচ্ছে হতাশার আদিম বাতাস- মনে হয় ভেসে যাচ্ছি চুর্ণ হয়ে যাওয়া কার্নিশ ঘেষে কোন হিম স্রোতের দিকে। এবারের বই মেলায় প্রকাশিত হয় নৈরিৎ ইমুর দ্বিতীয় কবিতা বই 'না মর্মরে, না মর্সিয়ায়' বইটি প্রকাশ করেছে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন। নতুন বই সম্পর্কে জানতে চাইলে কবি বলেন "
'না মর্মরে না মর্সিয়ায়' নিয়া আমারে যখন কিছু বলতে বলা হইলো তখন ভাবতেছিলাম আমার আর বলার কি আছে। বস্তুত আমি যা বলার তা কবিতায় বইলা শ্যাষ করি। এমন কি তারপরে অনিয়মের নিয়মেও লিখা বইয়ের ফ্ল্যাপে নিজের নামের পরে পরিচয়টুকু নিয়াও বিব্রতবোধ করি। এই বইটাতে খুব দ্রুতসময়ে লেখা কিছু কবিতা আছে। সব কবিতাই মনোমুগ্ধ মগজগাঁথা হয়া উৎকৃষ্ট বইতে রূপান্তরিত হইছে এমন প্রত্যাশার কিছু নাই। এই বাংলাসাহিত্যঅঞ্চলে আমি তৃণসম, করুণ জীবন যাপন করি। কিন্তু তৃণ প্রকৃতিসৌন্দর্যের নিরবিচ্ছিন্ন অংশ তাও অস্বীকার করি না। ফলত মহীরুহকে সম্মুখে রেখে আমি তার ছায়ানিরব মায়াকে আরও নিবিড় করতে নিজেকে কিছুটা অংশগ্রহণ করাতে পারছি কিনা সেইটা পাঠক দেখবেন। তবে আমার গণজাগরণী ব্যাপক পাঠক নাই। দরকারও নাই সেটা। যারা আছেন তারা নিঃসন্দেহে ক্ল্যাসিক পাঠক। এইখানে অবকাশ রাখা যাইতো যদিনা পরিচিত অপরিচিত আমার পাঠককূল আসলে নিতান্তই বই সংরক্ষণ বা সৌজন্য রক্ষার ক্রেতা হইতো। তারা আসলেই সিরিয়াস পাঠক। একটা বোধকে কানেক্ট করতে পারা ও টেক্সটকে কবিতা হিসেবে নিঁখুত রাখা দুইটা বিষয় এখানে গুরুতর। এই বইতে দৃশ্যকল্পের দিকে মনোযোগী হইছি বলা যায়। আর যেইটা ভাবছি সেইটা সাধারণ যাপনচিত্র, টানাপোড়েন, অস্তিত্বের বিচার৷ আমি আসলে কি চাইতেছি সেইটা পরিষ্কার হইতে হইতেও আপনার মধ্যে দ্বিধা তৈরি করতে পারে৷ আমার ধারণা মানুষ রহস্যাবৃত সময়কালকে বেশি আগ্রহ নিয়া ধরতে চায়। "তারে ধরি ধরি মনে করি, ধরতে গেলে...." কবিতাও এমন ব্যাপার আর কি। অ কবীর সুমনকে কেন উৎসর্গ করছি এইটা নিয়া অনেকে জিজ্ঞেস করছে, বাংলা গানের দিক থেকে কবীর আমার কাছে বেস্ট একজন। ইচ্ছা হইলো তাই করলাম। সে কি, কেন বা ব্যাক্তি কবীর সুমনরে আমি চিনতে চাই না। একজন গায়ক যার গান আমার ভেতরে সাড়া আনে তারে করছি। প্রশ্নের মধ্যে আরেকটা প্রশ্ন পাইছিলাম, দ্বিতীয় বই গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে আপনের বই কেমন মনে হইতেছে? আমি উত্তরটা দিচ্ছি। আমি কবিতাই করি, কবিতাই করবো। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় জানি না। যদি কিছু রাইখা যাইতে পারি তো কবিতাই তো রাইখা যাবো।"

বইটি পাওয়া যাবে বাংলা একাডেমি বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চন্দ্রবিন্দুর ৬০৭ নং স্টলে,

চট্টগ্রাম বইমেলার চন্দ্রবিন্দু (১২১-১২২),
পাবনা বইমেলা স্টল নং ১৩
সিলেট বইমেলা, স্টল নং ২৩-২৪
খুলনা বইমেলা, স্টল নং ৮৬-৮৭
এবং রকমারি.কম এ এখানে ক্লিক করে

অলৌকিক সত্তায় শক্তিমান কিংবদন্তী র‌্যাবো || অনুপম চৌধুরী

অলৌকিক সত্তায় শক্তিমান কিংবদন্তী র‌্যাবো || অনুপম চৌধুরী






‘পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের বাঁধনে বন্দী মানুষের জানাটা অত্যন্ত সীমিত এবং অজ্ঞ ও অন্ধের জানা। এই বৃত্ত থেকে একবার মুক্ত হতে পারলে তবেই মানুষ পঞ্চ-ইন্দ্রিয় বহির্ভূত অজানা, অচেনা, অসীম, অনন্ত আরো একটি জগৎকে জানতে পারবে এবং তখন সে নিজেই উপলব্ধি করবে যে- সে অসীম, অনন্ত ও প্রচণ্ড অলৌকিক সত্তায় শক্তিমান আর তখনই সে ছুঁতে পারবে, অনন্ত-অসীম, বিশাল ও ব্যাপক অন্য আরো একটি জগৎ ও সত্তাকে।’

- জ্যঁ নিকোলাস আর্তুর র‌্যাবো

ব্যাবোর কথাই বলছিলাম। পুরো নাম জ্যঁ নিকোলাস আর্তুর র‌্যাবো । ফরাসি কবি। মাত্র ৩৭ বছর বেঁচেছিলেন। জীবনকে তেমন একটা পাত্তা না দিয়ে বেহিসাবি জীবন লালন করতেন। এই অল্প বয়স নিয়ে সাহিত্যের এক বিশাল জায়গা দখল করে নিয়েছেন এই মহানায়ক। অনেক বাঘা-বাঘা সাহ্যিত্যের উজ্জ্বল লেখক পাত্তা না দিলেও একটা সময় অল্প লিখেও সাহিত্যের উঁচু স্থানটি দখল করে নিয়েছেন র‌্যাবো। জীবনের নানা বাঁকে নানা চড়াই-উৎরাই লেগেই ছিল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জীবনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারেন নি কেউ। এমনকি তার পরিবারও ব্যর্থ। এই মহানায়ককে নিয়ে বাংলা ভাষায় তেমন একটা লেখা নেই এবং কম লেখকই ওনাকে নিয়ে লিখেছেন। কিংবদন্তি এই ব্যাক্তিকে নিয়ে লিখেছেন মঈন ফারুক। যে বইয়ের নাম দিয়েছে- ‘ক্ষণজন্মা কিংবদন্তী’। লেখক যথার্থ নাম দিয়েই ওনাকে স্মরণ করেছেন। চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন থেকে আগস্ট-২০১৯ এ প্রকাশিত হয় এই অনুবাদ গ্রন্থ। যা ইতোমধ্যে সাড়া ফেলেছেন অনুবাদপ্রেমী পাঠকদের হৃদয়ে। এই কাজ নিঃসন্দেহে বিশাল কেননা ব্যাবোকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে উল্লেখ্যযোগ্য তেমন কোন কাজ নেই। কবি মঈন ফারুক সে কাজটি করেছেন। ভিতরের কোন এক তাড়না থেকে তিনি র‌্যাবোকে উন্মোচন করেছেন পাঠকদের সামনে। 
বইটিতে র‌্যাবোর জন্ম থেকে মৃত্যু অবদি লেখক জীবনই স্থান পেয়েছে, বলা যায় পূর্ণাঙ্গ র‌্যাবোকে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন লেখক। বইটিতে র‌্যাবোর কিছু কবিতা অনুবাদ থাকলে ষোলকলা পূর্ণ হতো। হয়তো লেখক র‌্যাবোকে নিয়ে আরও কাজ করবেন বলে কবিতা অনুবাদ এই বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করেননি। বইয়ের শুরুতে প্রাককথাতে মঈন ফারুক বলে দিয়েছেন, আশি পৃষ্ঠার এই বইয়ের ভিতরে পাঠকদের জন্য কী অপেক্ষা করছে। তিনি বলেছেন- ‘র‌্যাবোর চিন্তা কী ছিলো? কী করতে চাইতেন? কী খুঁজতেন? এমন বহুবিধ প্রশ্ন অজানা মনে প্রশ্ন আশ্রয় নেয়।’ 
এই আশ্রয়ের উত্তর পাওয়া যাবে এই বইয়ে। আরেকটু বলি, ১৮৫৪ সালে ২০ অক্টোবর তিনি ফ্রান্সের শার্লভিল-মেজিয়ের শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তার অধিকাংশ কবিতাই লিখেছিলেন কিশোর বয়সে। 
র‌্যাবোর পরিবারটি ছিল মধ্যবিত্ত। বাবা সৈন্য, মা গৃহিনী। ইসাবেল নামে এক বোন ছিল র‌্যাবোর। বড় এক ভাইও ছিল। র‌্যাবোর বয়স তখন দু’বছর- তখনই তার মা-বাবার বিচ্ছেদ ঘটে। বাবা নয়, র‌্যাবোর ছেলেবেলা জুড়ে ছিল মায়ের কঠোর শাসন। মায়ের শাস্তিও ছিল অদ্ভুত রকমের, পড়া না পারলেই ১০০ লাইন লাতিন কবিতা মুখস্থ করতে হত। এরপরও আবৃত্তি ভুল হলে খাবার জুটত না। ৯ বছর বয়েসেই তাই ৭০০ লাইন লাতিন কবিতা ঠোটস্থ হয়ে গেছিল র‌্যাবোর। তাদের বাড়ির নিচেই ছিল বিরাট এক লাইব্রেরি। খুব অল্প বয়সেই সেখানে বসে তিনি ফেনিমোর কুপার, গুস্তাভ আইমোর, জুল ভের্ন থেকে শুরু করে হেগেল ও সোয়েডনবর্গের দর্শন, প্রুদম, ফ্রান্সের লোককাহিনী এবং ইতিহাস ও সাহিত্য, এমনকী প্রাচ্য তথা ভারতীয় ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থ, দর্শন, ধর্ম প্রচারক এবং দেব-দেবী ও দেবালয় সম্বন্ধেও পড়াশুনো করেন। মাত্র সতেরো বছর বয়সেই অত্যন্ত আলোড়ন উদ্রেককারী কবিতার মাধ্যমে তিনি প্যারিসের কবিসমাজকে উদ্বেলিত করে তুলেছিলেন। তার মাতাল তরণী কবিতাটি পড়ে সেযুগের ফ্রান্সের অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয় প্রতীকবাদী কবি পল ভর্লেন তার প্রতি অত্যন্ত আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত পর্যায়েও উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মাত্র ২০ বছর বয়সেই তিনি সব ধরনের সৃষ্টিশীল লেখালেখি ছেড়ে দেন। এরপর তিনি আরব এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে ভ্রমণ করেন। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৮৯১ সালের ১০ নভেম্বর মৃত্যুকে বরণ করেন। তার বিখ্যাত লেখার মধ্যে নরকে এক ঋতু, মাতাল তরণী এবং গদ্য কবিতা ইলুমিনাসিও অন্যতম।

র‌্যাবোর জীবন ছিলো অন্য দশটি জীবনের চেয়ে অনেকটা ভিন্ন। তার জীবনের সমস্ত কিছু এই বইতে পাবেন। বইয়ের দাম রাখা হয়েছে- ২০০। প্রচ্ছদ করেছেন- আল নোমান। বইয়ের প্রচার ও প্রসার কামনা করছি। বাংলা সাহিত্য ভাণ্ডারে এ রকম আরো লেখা যোগ হোক।

র‌্যাবোর একটি কবিতা দিয়ে লেখা শেষ করব- ‘মরুভূমি প্রান্তর ভালোবাসি আমি, শুকনো ফলাদির বাগান, ফ্যাকাশে ম্রিয়মান পরিত্যক্ত আলয়, শীতল পানীয় জলের স্পর্শের ধারা। নিজেকে টেনে নিয়ে যাবো পচা দুর্গন্ধের অলিগলি দিয়ে বন্ধ চোথের কাছে, সোপর্দ করবো তীক্ষ্ণ আলোক রশ্মির দিকে, আগুনের স্রষ্টা যিনি।’ 
...দুধের গাই—এজমালি বাগান... ও এক লিপিচাষির স্লেট ।। নকিব মুকশি

...দুধের গাই—এজমালি বাগান... ও এক লিপিচাষির স্লেট ।। নকিব মুকশি

লোকে বলে আমি অন্যমনস্ক। প্রাত্যহিক জীবনের চলমান কাজের প্রতি একাগ্র নই। এই ধরুন, ব্রাশে টুথপেস্ট লাগাতে গিয়ে ফেসিয়াল ক্রিম লাগিয়ে ব্রাশ করতে শুরু করি, তখনই বোধোদয় হয়; বাথরুমে যেতে গিয়ে কলপাড়ে চলে যাই, তখনই বোধোদয় হয়; যেটা আনার জন্য অন্দরমহলে ঢুকি, সেটা না নিয়ে কিংবা কিছুই না নিয়ে আবার বেরিয়ে আসি; একই রুমে বসে আছি কাছাকাছি, কেউ ডাকছে বারবার, তবু কর্ণপাত নেই—এমন সব ঘটনা ঘটে রোজ। ছোট বেলায় মা মনে করতেন, আমার কানে কোনো সমস্যা আছে। কিন্তু না, কিছু দিনের মধ্যেই মা বুঝতে পারেন যে আমার কানে কোনো সমস্যা নেই, শুধু মা না, বাড়ির প্রায় সবাই বুঝতে পারে যে আমি কী যেন ভাবি, কী সব ভাবনায় মশগুল থাকি, কোথায় যেন হারিয়ে যাই! ফলে মার কাছ থেকে মাঝেমধ্যেই শোনা লাগতো, ‘ডাকলে আমল করস না কা’, ‘আমলহারা হয়ে গেছ’। আজ আমার মনে হয়, সত্যিই আমি মাঝেমধ্যে আমলহারা হয়ে যাই। আমার এক জগৎ আছে, সেখানে নিজের খেয়াল-খুশিমতো ঘুরে বেড়াই। এক নিজেকে প্রতিপক্ষ দাঁড় করে আরেক নিজেই অসি-মসিযুদ্ধে নেমে পড়ি। আকাশের মেঘের লগে, কখনো এই নদী-জল-পাহাড়-মাটি-মানুষ ও ঈশ্বরের লগেও তর্ক করি; হাওয়ায় প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুঁড়ে মারি। মাঝমধ্যে কোন কোন প্রশ্নের উত্তর পাই, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উত্তর পাই না। প্রাইমারি স্কুলের হাওয়াও এমনই ছিল। একাই চলতাম, একাই এক বিশাল জগৎ নিয়ে ঘুরতাম।

একার মাঝে সেই হারিয়ে যাওয়ার, ভ্রমণ করার ঘটনা এখনও ঘটে। ভেতরের আমিটি যখনই একটু মুক্তি পায়, তখনই সে আমাকে নিয়ে উড়াল দেয়। নিজেকে খুড়তে ভালো লাগে, যতটা না খেলতে ভালো লাগে। মনে করি, আমার সমস্ত আমিত্ব এই আমার অন্তরেই লুকিয়ে আছে। তাকে খুড়ে বের করা আমারই দায়িত্ব। ফলে আমার অন্দরমহল একা হলেই আমি প্রত্নতাত্ত্বিকের ভূমিকায় নামি। বিশ্বাস, সেখানে অনেক মণি-মরকত, প্রিজমরশ্মির পাতলা পর্দায় ঢেকে আছে। তারা বের হতে চায়। তারা মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় আমারই তাকিয়ে আছে।

মনে হয়, পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণী, যারা আত্মদাগে নিজের স্লেট ভরে শ্বাশত আকাশে ঝুলিয়ে রাখতে পারে, যা অন্য প্রাণীর পক্ষে সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিজের আত্মাকে ফাটানো। চূর্ণবিচূর্ণ করে তার ভেতরের নির্যাস বের করে আনা। ফিঙ্গারপ্রিন্ট যেমন বলে প্রতিটি মানুষ আলাদা, তেমনি প্রতিটি মানুষের আত্মার রঙও আলাদা। সেখানে যদি ডুব দেওয়া যায় এক জীবনের নিশ্বাস নিয়ে, তবে নিজের আকাশ তুলে মানুষের দরবারে এনে পতাকার লাহান পতপত করে উড়ানো যায়। মানুষ সেখানে সমবেত হয়ে গুচ্ছ গুচ্ছ ছায়া, মায়া ও প্রেম দেখতে পায়।

আমার অনেক দিনের চেনা রাস্তাও প্রায়শই অচেনা ঠেকে। অতি পরিচিত জায়গাটির নামও হঠাৎ ভুলে যাই। যে এলাকায় বহু বছর ধরে থাকি, সে এলাকায় যেন আমি এইমাত্র এলাম—এমন পরিস্থিতে ফেলে আমার চোখ ও স্মৃতিশক্তি। আনমনা হয়ে পথ চলাই হয়তো এর অন্যতম কারণ কিংবা সত্যি সত্যিই আমার স্মৃতিশক্তির অবস্থা খুবই বাজে, নিম্ন লেভেলে আছে। আমি পথ চলি, পথেরই কোনো একটি বিষয় নিয়ে পথেই হারিয়ে যাই। ফলত পথের পাশের বিষয়বস্তু আর চেনা হয়ে ওঠে না। যে পথে প্রতিনিয়ত কাজে যাই, রোবটের লাহান সে পথেই অচেতন হয়ে চলি—যেন আমি এক অন্ধ, পূর্ব অভিজ্ঞানই আমাকে নিয়ে যায় গন্তব্যে।

একদিন পথ চলতে চলতে মাথায় আসলো ‘গাইবাঁট—ঝরনার বরফ...’ এমন একটি লাইন। মনে হলো, বাহ্, এমন মেটাফর, সুর ও সিনটেক্সে কিছু কবিতা লেখাই যেতে পারে। ওই দিন এ একটা লাইন নিয়ে সারাটা দিন কাটলো। কতভাবে ভেবেছি লাইনটি নিয়ে, কতভাবে নিজেকে মুগ্ধ করেছি। গাইয়ের স্তনের বোঁটা ও জল চুঁইয়ে পড়া বরফের প্রান্তবিন্দু একাকার হয়েছে এ লাইনে, যা আমার ভেতর চিন্তা-দর্শনের ব্যাপন ঘটিয়েছে ব্যাপক। লাইনটির ব্যাখ্যা অনেক বড় করে, অনেক অ্যাঙ্গেল থেকে দিতে পারি। কিন্তু কবির পক্ষে এই ব্যাখ্যা করাটা শোভন মনে করি না।

এই ফর্মে নতুন উদ্দমে একটি পাণ্ডুলিপি দাঁড় করানোর চেষ্টায় কবিতাখেতে নেমে পড়লাম। বেশ কতগুলো কবিতা লেখা হলো। কবিতাগুলোর নাম দিলাম—‘হেজিমনিক পোয়েট্রি’। এমন নামের কারণ হলো কবিতাগুলোর ফর্ম ও সুর। গ্রামসির কালচারাল হেজিমনির ধারণা থেকেই কবিতায় হয়তো এই নামটি এসেছে। মনে হলো লাইনগুলোর অ্যাপ্রোচে আধিপত্যবাদীর আচরণ লক্ষ করা যায়। সুরটাও আনকোরা। ফর্মটাও কেমন অকবিতার-অকবিতার! হয়তো অনেকেই এগুলোকে কবিতা বলতে নারাজ হবে। তা-ই যদি হয়, তবে এ টেক্সটের নাম কী দেওয়া যায়? পৃথিবীতে যা কিছু প্রচলিত, তা একসময় ছিল না, আর্বিভূত হয়ে প্রচলিত হয়েছে সময়ের পরিক্রমায়। আবার এই প্রচলিত ব্যাপারটিও একসময় অপ্রচলিত হয়ে যায় নতুন প্রচলনের ভাঁজে পড়ে অর্থাৎ আমরা দেখতে পাই, অপ্রচলিতকে প্রচলিত করার মধ্য দিয়েই পৃথিবী গতিশীল রয়েছে। আমার একটি লাইন আছে এমন—‘একটি বসন্তকে ঢেকে দিতে পারে কেবল আরেকটি বসন্তই’। ফলে মনে হয়েছে, মানুষ ও অন্য প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম পার্থক্য হচ্ছে মানুষ প্রতিনিয়ত একটি অর্জনের ওপর দাঁড়িয়ে আরেকটি অর্জন নিয়ে আসে, অপ্রচলিতকে প্রচলিত করে; কিন্তু অন্য প্রাণীরা জিনপ্রাপ্ত গুণে ভর করে একই বৃত্তে ঘুরপাঁক খাচ্ছে, যেখানে নিজের সত্তা টিকিয়ে রাখা ছাড়া আর কোনো অর্জন নেই। মনে করি, পৃথিবীতে মানুষ যা কিছু আবিষ্কার করে নতুন বলে প্রচার করছে, তার মূলমন্ত্র ও নির্যাস এখানেই নিহিত। মানুষ শুধু তার একটি রূপ, শৈলী ও নির্যাস দিয়ে ভিজিবল করছে মাত্র। ফলে এই ভিজিবল অবজেক্ট বা চিন্তাগত বিষয়কে নতুন না বলে আমি বলি অপ্রচলিত। বলি এ কারণে যে এগুলো এখানেই ছিলো, মানুষ জোঁড়াতালি দিয়ে প্রচলিত করছে মাত্র।

বই আকারে প্রকাশের আগে ‘হেজিমনিক পোয়েট্রি’ নামটি পরিবর্তন করে অবশেষে রাখলাম—‘...দুধের গাই—এজমালি বাগান...’ এবং যে ফর্মে কবিতাগুলো লেখা হলো, তার নাম রাখলাম—‘হেজিমনিক ফর্ম’। অন্যত্র এই বইয়ের করণকৌশল ও ফর্ম নিয়ে লিখবো। বইটিতে একটি পঙক্তি আছে, ‘গাভির দুধ—মহান মানুষের নির্ঝর—সাপও খেয়ে যায় রাতেবিরাতে...’। আমার জগতে সাপও গুরুত্বপূর্ণ, উপযোজক। দুধ পেলে সাপেরও বিষ ঝরে না। আরেকটি লাইন এমন, ‘সমস্ত ফুল—জারজ সন্তান—পিতার সন্ধানে নামেনি কোনো দিন...’। সুন্দর নিজেই স্বয়ম্ভু, পিতা তারই কাছে নত, তারই মুখাপেক্ষী। পুরো বইজুড়ে এভাবেই আমি বস্তুজগৎ ও হাওয়ালোককে দেখেছি। পাঠককে বলেতে চেয়েছি, মেয়েটির চিবুকে, ঠোঁটে, নাকে কিংবা বুকের ঠিক ওপরে যে জ্বলজ্বলে তিল দেখতে পাচ্ছো, মূলত এটাই চাঁদ, তুমি বিশ্বাস কর এটাই চাঁদ, নক্ষত্র। এভাবেই হেজিমনি তৈরি হয়েছে এই কবিতাখেতের আলপথ ধরে।

অন্য পাড়ে, অন্য গ্রহে নিজের আত্মার সঙ্গে সংলাপে মশগুল থেকে কবিতায় এক ভিন রঙ দিতে চেয়েছি। সন্দেহ প্রকাশ করেছি, ‘বন্ধ্যা বাগানের পাশে কারা যেন রোজ রোজ ছড়ায় বাজারের ঘ্রাণ...’। ফণাতন্ত্রের আদলে যে ফ্যাসিজমের শির উচিয়েছে, তারই নেমপ্লেটে বসেয়েছি ‘পিল—মীন না জানা এক চিল...’ নামের অশ্রুত পঙক্তি। বিশ্বের যেখানে মানুষের চোখে ফোটে ‘বিবাহদেহ—গম-রঙের ভূমি’, আমি সেখানেই ডাকি, এসো ‘দুধের গাই—এজমালি বাগান...’, আমাকে তোমার সন্তান কর। আমি তোমার প্রতিরূপ দিয়ে পৃথিবী ভরে দেবো, তবেই মুছে যাবে রক্তবাদ ও সমস্ত মানচিত্র। আমরা দলে দলে হয়ে যাব দুধের গাই, হয়ে যাব এজমালি বাগান।

নকিব মুকশি
ফার্মগেট, ঢাকা

প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, এক্সিলেন্ট আইডিয়াল স্কুল। বর্তমানে একটি দৈনিক পত্রিকায় কর্মরত।

সম্পাদক, চাতর (সাহিত্য পত্রিকা)

পড়াশোনা:

স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

প্রকাশিত বই:

প্রতিশিসে অর্ধজিরাফ, জেব্রাক্রসিং প্রকাশন, বইমেলা-২০১৯।

...দুধের গাই—এজমালি বাগান..., চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন, বইমেলা-২০২০

ডুবোজাহাজের ডানা’ এক পরিণত কবির নিবেদন

ডুবোজাহাজের ডানা’ এক পরিণত কবির নিবেদন

(কবি জিললুর রহমান বলছেন মোশতাক আহমদের কবিতার বই ‘ ডুবোজাহাজের ডানা’ নিয়ে) 

কবি মোশতাক আহমদকে পড়ে আসছি, দেখে আসছি আশির দশকের শেষার্ধ থেকে; তিনি আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চা আর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সতীর্থ। কবি মোশতাক আহমদ তাঁর প্রথম বই ‘সড়ক নম্বর দুঃখ বাড়ি নম্বর কষ্ট’ থেকে ক্রমাগত নিজের কবিতার ভাষাকে, কবিতার প্রকরণকে পালটে নিচ্ছেন। এটা জীবনেরই ধর্ম, কবিদের ধর্ম।

‘ ডুবোজাহাজের ডানা’র নামকরণে আছে ইঙ্গিতময়তা। এ যেন অন্তরালে থেকে কবির নিজস্ব পদ্ধতিতে জগতের সংবাদ অবগত থাকা। সামুদ্রিক অনুষঙ্গ প্রধান এই বইটি চারটা পর্বে বিভক্ত, চারটা পর্বেই আছে বিষয় ও আঙ্গিকের ভিন্নতা। প্রথম পর্ব ‘সাবমেরিনের সার্সি’তে ছোট ছোট বিষয় নিয়ে কবিতা লিখেছেন। ‘অনুপস্থিত জলের এলিজি’ একটি ইঙ্গিতময় কবিতা যেখানে কবির পরিণত হবার ছাপ পাওয়া যায়, ‘দুরত্বের গান’ কবিতায় আমাদের অনিত্য জীবনের ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন-

‘ জলরঙ ছবি আমি

ধুয়ে যাব প্রথম বর্ষায়।‘

তাঁর কবিতা ভিন্ন ভিন্ন পাঠককে ভিন্ন ভাবে ভাবায়।
দ্বিতীয় পর্বের কবিতাগুচ্ছ ‘দীর্ঘ ইমন’। কাহিনির আভাস পাওয়া যায় অন্য আমেজের এই কবিতাগুচ্ছে। ‘চন্দ্রনাথের প্রজাপতি ‘ একটি অসাধারণ স্মৃতিকাতর কবিতা। স্মৃতিময়তা আর বন্ধু বাৎসল্যের স্বাদ পাই ‘হস্তরেখার আলপথে’ কবিতায়, কিংবা ‘তারাপদ রায়ের কাণ্ড’ কবিতায়। কবিতাগুলোতে কবির স্বর পালটানো খুবই উপভোগ্য। কবি প্রতিনিয়ত স্বর, সুর পাল্টাচ্ছেন সেই চিহ্ন তাঁর কবিতায় আছে।

‘গদ্যগহন করোটি’ পর্বের কবিতাগুলো টানা গদ্যে লেখা। ভাব গাম্ভীর্যে আমাদেরকে অন্য এক বিপন্ন বিষ্ময়ের দিকে ঠেলে দেয়। আমরা বরফ যুগের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি; কিন্তু যতদিন পৃথিবীতে জীবন আছে, কবিরা জীবনের কথা বলবেন, অমরতার কথা বলবেন। এই বইতে বয়সোজনোচিত কারণেই মোশতাকও নানাভাবে এই বিষয়টা নিয়ে এসেছেন।

‘আর্ত চতুর্দশী’ পর্বে কয়েকটি সনেট আছে; এই সনেটগুলোই মোশতাক আহমদের এই বইয়ের প্রাণভোমরা! শেষ সনেট ‘সমুদ্রপীড়া’য় অসাধারণভাবে সময় ও জীবনকে ধরেছেন -

গড়িয়ে পড়ছে ধীরে দালির ঘড়িটা

পাণ্ডুর সময় গিলেছে সমুদ্রপীড়া ।

কবি মোশতাক আহমদ তাঁর কবিতায় বঙ্গীয় উত্তর আধুনিকতার কিছু নিদর্শন রেখেছেন; আন্তর্বয়ন নিয়ে খেলেছেন বিভিন্ন কবিতায়। তাঁর ‘ছেলেবেলার গানে’র আন্তর্বয়নে মনে পড়ে যায় ঠাকুর কবির বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুরের কথা, ‘ নকটার্ন’ কবিতায় এসেছে ‘জীবনদাশের ধুসর জগত’ কিংবা ‘ভ্যানগগের তারাভরা রাতে’র কথা। এক এক কবিতায় এক এক কৌশলে তিনি আন্তর্বয়ন ব্যবহার করেছেন।
 চিত্রকল্প ব্যবহারে তাঁর মুন্সিয়ানা আছে। ছন্দ নিয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু ছন্দের ধারাবাহিকতা পাওয়া যায় না। হয়তবা কথনের স্পন্দনে অধিক বিশ্বাসী । ছন্দের ব্যাপারে সমালোচকদেরকে অগ্রিম জবাব দিয়েও রেখেছেন ‘ডাইলেমা’ কবিতায়- যেখানে ছন্দ লেখা আর কবিতা লেখার কথা নিয়ে কাব্যিকভাবে বিতর্ক করেছেন-

‘রূপকথার পাতা থেকে লাফ দিয়ে পালানো বিড়ালের হাসি

অস্তনীল আকাশের রঙে হারায় কবিতার মত,

বেওয়ারিশ ভাসছে ছন্দের শাদা ইজেল।

বিড়ালেরা হারিয়ে যায় হাসিগুলো রেখে

আকাশ হারিয়ে গেল গাঢ় নীল ছোপে।

তাহলে কবিতা লিখো না, ছন্দই লিখো

মনে কর যদি
অমরতা আর ঋদ্ধি
ওখানেই জায়মান!

তাহলে ছন্দে লিখো না, কবিতাই লিখো
মনে কর যদি
রক্ত অশ্রু নদী
শিয়র অবধি!'

মোশতাকের এই কবিতা নিয়ে অন্য একজন আলোচকও বলেছেন, “ কবি জিগ্যেস করছেন, তুমি কি ছন্দ লিখতে চাও নাকি কবিতা লিখতে চাও! কেউ বলবে যার ছন্দ নাই, তার কবিতাও হয় না; অর্থ্যাত শিল্পের জন্য শিল্প। কেউ বলবে জীবনের জন্য শিল্প। মোশতাক হচ্ছে এই দুই ধারারই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।“

মোশতাক লিখে যাচ্ছেন কবিতা, গল্প, স্মৃতিকথা, অনুবাদ কবিতা। তিনি বাংলা সাহিত্যের জন্য একজন জরুরী লেখক। ‘ ডুবোজাহাজের ডানা’ এক পরিণত কবির নিবেদন।

( ডুবোজাহাজের ডানা, কবিতা, বাতিঘরের সহযোগী প্রতিষ্ঠান কবিতাভবন থেকে প্রকাশিত, ফেব্রুয়ারি ২০২০, প্রচ্ছদ নির্ঝর নৈঃশব্দ্য, মূল্য ১৩৪ টাকা)
মেলায় পাওয়া যাচ্ছে রাসেল রায়হানের নতুন উপন্যাস 'অমরাবতী'

মেলায় পাওয়া যাচ্ছে রাসেল রায়হানের নতুন উপন্যাস 'অমরাবতী'

অমর একুশে গ্রন্থমেল ২০২০-এ চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয় রাসেল রায়হানের নতুন উপন্যাস 'অমরাবতী'। মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল নিয়ে এই উপন্যাস সম্পর্কে রাসেল রায়হানের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন: 'অমরাবতী মূলত মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল নিয়ে একটা উপন্যাস। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের এক ক্রিকেটার বাদলের পাকিস্তান জাতীয় দলে খেলার জার্নি। সে প্রায় পৌঁছেও যায়, কিন্তু তার ফলে তাকে কিছু ত্যাগ করতে হয়। এ সময় শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তখন তাঁর স্বপ্ন বাঁক নেয়। গন্তব্য পালটে যায়। অমরাবতী সে স্বপ্নের দিকে গন্তব্যের গল্প।
একদল মেডিকেল অ্যাসিসট্যান্ট চট্টগ্রাম সেনানিবাসে চাকরি করত একাত্তরে। যখন একের পর এক পাকিস্তানি সৈন্য ভর্তি হতে শুরু করল, অদ্ভুত এক উপায়ে তাদের তারা মেরে ফেলতে লাগল, পাকিস্তানি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সেটা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি। কিন্তু যখন পায়ের পাতায় গুলি লেগে এক সৈন্য ভর্তি হয়ে দুদিনের মাথায় মারা গেল, তখন সন্দেহ হয় তাদের, এবং তারা পদ্ধতিটা ধরে ফেলে। তারপর কী হয় তাদের? অমরাবতীতে সেই গল্পটা বলা হয়েছে।
হরিপদ নামের এক স্বর্ণকার জামিলকে পালক নেয় তার শৈশবেই। জামিল ধীরে ধীরে স্বর্ণকার হয়ে ওঠে, তার চেয়েও বড়। তারপর একাত্তরে হুট করে হরিপদ সবকিছু জামিলের ঘাড়ে ফেলে উধাও হয়ে যান। জামিল যক্ষের মতো সব পাহারা দিতে থাকে আর হরিপদকে খুঁজতে থাকে। অমরাবতী এই খোঁজা আর বিশ্বাস রাখার প্রচেষ্টার গল্প। আর এই তিনটা গল্প একটা সুতায় বাঁধা পড়ে। সেই সুতাই এই উপন্যাস।

বইটি পাওয়া যাবে বাংলা একাডেমি বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চন্দ্রবিন্দুর ৬০৭ নং স্টলে,
চট্টগ্রাম বইমেলার চন্দ্রবিন্দু (১২১-১২২),
পাবনা বইমেলা স্টল নং ১৩
সিলেট বইমেলা, স্টল নং ২৩-২৪
খুলনা বইমেলা, স্টল নং ৮৬-৮৭
এবং রকমারি.কম এ এখানে ক্লিক করে
বইমেলায় পাওয়া যাচ্ছে হামিম কামালের নতুন উপন্যাস 'জাদুকরী ভ্রম'

বইমেলায় পাওয়া যাচ্ছে হামিম কামালের নতুন উপন্যাস 'জাদুকরী ভ্রম'







হামিম কামাল বর্তমান সময়ে ঔপন্যাসিকদের মধ্যে একটি পরিচিত নাম। ব্যতিক্রম ও শৈল্পিক গল্পে পাঠকের মনে জায়গা করে নেওয়ার এক শক্তিশালী জাদুকরী শক্তি আছে তার মাঝে। যিনি সাহিত্য'কে ধারণ করেন মন মননে, সর্বত্র। এবারের অমর একুশে বইমেলা ২০২০- এ হামিম কামালের নতুন উপন্যাস 'জাদুকরী ভ্রম' প্রকাশিত হয়েছে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনের ব্যানারে। নতুন বই সম্পর্কে জানতে চাইলে লেখক জলফড়িং'কে বলেন: 'আমি আধ্যাত্মিকতা পছন্দ করি। পছন্দ করি মন্ত্র, ধর্ম, উৎসব। ভালোবাসি বিজ্ঞানের সন্দেহবাদকেন্দ্রিক সৎ অভিযাত্রা। আমি বিশ্বাস করতে ভালোবাসি এ জগৎ এক আনন্দময় মহানিয়মের অধীন। সেই উদার মহানিয়ম প্রতিমুহূর্তে নিজেকে আমাদের মনের চোখের সামনে ব্যক্ত করছে। আমার আধ্যাত্মিকতাবোধ, মন্ত্র, ধর্ম, উৎসবের সংজ্ঞা মোটেও নতুন নয়, বরং আদিম, পুরাতন। তবে তা ধ্রুপদী বলে প্রত্যেক যুগেই হয়ত তাকে নবীনা তরুণীর মত দেখায়।
ভারসাম্যের শর্ত মেনে প্রত্যেকেই ভালো বা মন্দ কিছু না কিছু করে। প্রশ্ন জাগে, আমি কী করতে এসেছি? এ জগতে প্রত্যেকেই মূলত স্বধর্ম প্রচার করতে আসে। কেউ তা জানে, কেউ তা জানে না। যে জানে, সে কাছে ডাকে, বা ছুটে যায়। যে জানে না, সে কেবল অন্যের অনুসরণ করে। বোধয় এ জন্মে আমি আমার অনেক জন্মের বোধের কথা, বোঝাপড়ার কথা মানুষকে গল্পে গল্পে শোনাতে, আর ছবি এঁকে দেখাতে এসেছি। উপন্যাস 'জাদুকরী ভ্রম' তার নিদর্শন কিনা প্রকৃতিই ভালো জানে।

জলফড়িঙের মাধ্যমে সবাইকে তা পড়ার ও দেখার বিনীত আবেদন জানাই।'

বইটি পাওয়া যাবে বাংলা একাডেমি বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চন্দ্রবিন্দুর ৬০৭ নং স্টলে, চট্টগ্রাম বইমেলার চন্দ্রবিন্দু (১২১-১২২),
পাবনা বইমেলা স্টল নং ১৩
সিলেট বইমেলা, স্টল নং ২৩-২৪
খুলনা বইমেলা, স্টল নং ৮৬-৮৭
এবং রকমারি.কম এ এখানে ক্লিক করে
মেলায় পাওয়া যাচ্ছে নাহিদ ধ্রুব'র গল্পের বই হিম বাতাসের জীবন

মেলায় পাওয়া যাচ্ছে নাহিদ ধ্রুব'র গল্পের বই হিম বাতাসের জীবন

'হিম বাতাসের জীবন' নাহিদ ধ্রুব'র প্রথম গল্পের বই। অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২০ সালে বইটি প্রকাশিত হয়েছে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনের ব্যানারে। ৫ ফর্মার এই বইয়ে আছে ২০ টি ছোট গল্প। 

নাহিদ ধ্রুব'র এর আগে ২ টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল। কবিতা থেকে গল্পে আসা প্রসঙ্গে নাহিদ ধ্রুব'র কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, 'আমি কবিতা'কে নিজের মতো ভালোবাসি, আবার আমি নিজেকে অন্য প্রত্যেক'টা মানুষের মতো ভালোবাসি। তো, ভালোবাসা যেহেতু লুকিয়ে রাখার ব্যাপার না সেহেতু কবিতা লেখার শুরু। এই কবিতা লিখতে লিখতে একটা সময় দেখলাম কবিতা লেখার পরেও অনেক না বলা কথা কোথায় যেন রয়ে যাচ্ছে... এই কথা গুলো অহেতুক খুব জ্বালাতন শুরু করলে একদিন মাঝরাতে কিবোর্ডে বসে টাইপ করা শুরু করলাম। প্লট আমার মাথায় ছিল, কীভাবে লিখবো সেটা আমি জানতাম না। তাই, কোন টুলসের কথা চিন্তা না করেই লিখতে শুরু করলাম। লেখা শেষে দেখলাম পুরো টেক্সট'টা একটা অবয়ব পেয়েছে, যেটা ছোটগল্পের। তারপর মনে হলো, বেশ তো, লিখতে থাকি। এভাবেই মূলত গল্পে আসা। বিশেষ কোন কারণে না। আমার মূল লক্ষ্য কথা 'টা বলা, এখন সেটা বলতে গিয়ে যদি কখনও অন্য কোন মাধ্যমের সাহায্য নিতে হয় তাহলে হয়তো আগামী'তে অন্য কোন মাধ্যমের দ্বারস্থ হবো!' 

'হিম বাতাসের জীবন' বইয়ের মূল সেন্টার অব কন্সেন্ট্রেশন সম্পর্কে জানতে চাইলে লেখক বলেন, 'এই বইয়ের গল্প গুলো মূলত গ্লোবাল এনার্কি / ডিপ্রেশন  আর ভবিষ্যতের বাস্তবতা'কে সিগনিফাই করেই গড়ে উঠেছে। ২০টি গল্প ২০টি অনুভূতির জায়গা থেকে তৈরি হলেও কোথাও হয়তো এরা একই সুরে বাজছে, যে সুর'টা করুণ।' 

বইটির গল্পে যুদ্ধ / হতাশা / প্রেম / বিচ্ছেদ সহ বিভিন্ন বিষয়'কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গল্পগুলো একটি কমপ্লিট সিনেমার স্বাদ দিতে সক্ষম এবং এই সিনেমাটি আব্বাস কিয়ারোস্তামির সিনেমার মতো পাঠক'কে দিতে পারে একটি পোয়েটিক রিয়েলিটির সন্ধান। 

হিম বাতাসের জীবন পাওয়া যাচ্ছে ঢাকা বইমেলায় চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনের ৬০৭ নাম্বার স্টলে। চট্টগ্রাম, সিলেট , পাবনা এবং খুলনা বইমেলাতেও পাওয়া যাচ্ছে বইটি। অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে রকমারি'তে।
চাঁদগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে ।। কুশল ইশতিয়াক

চাঁদগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে ।। কুশল ইশতিয়াক

চাঁদগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে বইটা সম্পর্কে কোনো একক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। লেখক হিসেবে কেউ যদি আগ বাড়িয়েই বলে দেয়, যে সে কী লিখেছে, তাহলে পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গিকে একটা শেকল দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। হতে পারে, বিভিন্ন পাঠক বিভিন্নভাবে চিন্তা করবে লেখাগুলো নিয়ে। কিন্তু সেটা করতে হলে তাকে তো প্রথম বইয়ের মধ্যে ঢুকতে হবে৷ 

বইটির ফ্ল্যাপে কয়েকজন লেখকের মন্তব্য বইটি সম্পর্কে টুকটাক ধারণা অবশ্য পাঠককে দিতে পারে।

"কখনো পোলিশ আক্রমণে পর্যুদস্ত কোনো শহর, কখনো বাংলাদেশ টেলিভিশনের ছায়াছবি আক্রান্ত দুপুর। কোথাও ফেরেশতার খসে যাওয়া পালক, কোথাও মনিটরে ছিটকে পড়া রক্ত।
কুশল ইশতিয়াকের মূল কুশলতা, কেটে কেটে নেওয়া ছবির স্ন্যাপশট দিয়ে গল্প বলায়।"
সুহান রিজওয়ান, ঔপন্যাসিক

"চেতন আর অবচেতনের মাঝে একটা জগত আছে। 'চাঁদগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে' বইটি সে জগতের সন্ধান দেয়। স্বাভাবিক রিয়েলিটির তোয়াক্কা না করে এই বইয়ের গল্পগুলো আমাদের নিয়ে যায় এক পোয়েটিক রিয়েলিটির কাছে, যা আব্বাস কিয়ারোস্তামির সিনেমার মতো সুন্দর।"
নাহিদ ধ্রুব, কবি

"কখনো কখনো সিঙ্গেলসই ম্যাচ জেতায়। কুশলের গল্পগুলো সহজ, অথচ কল্পনায় ভরা, আর তেমনই, যেমনটা ও নিজের মতো করে বলতে চায়...."
মাহবুব ময়ূখ রিশাদ, কথাসাহিত্যিক

"গল্পগুলো অতিলৌকিক জগতের জাদুতে মোড়া। অমন যাদের পছন্দ, তাদের জন্যে পড়ার গভীর আনন্দ এখানে অপেক্ষা করে আছে। গল্পের ধারাটা বোধয় ভবিষ্যতের। ভাষার রীতিটাও। তবে সব ছাপিয়ে নির্জলা গল্পের নেশায় বেহেড মাতাল হয়ে আছি। ঘোর কাটছেই না।"
হামিম কামাল, কথাসাহিত্যিক

"গল্পগুলো পড়তে পড়তে মনে হয় বেঁচে থাকার অর্থহীনতা, নিঃসঙ্গতা, আর এক ধরনের গণ-নির্লিপ্তি চরিত্রগুলোকে গিলে নিচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। আর সবকিছুর ওপর ছায়াবিস্তার করে রেখেছে রহস্যের গুচ্ছগুচ্ছ মেঘ। দম নেয়ার সুযোগ নেই প্রায়, পাঠকেরা এমন অবস্থায় বিচিত্র সব কাজ করে বসে!"
এনামুল রেজা, কথাসাহিত্যিক

বইটি পাওয়া যাবে বাংলা একাডেমি বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চন্দ্রবিন্দুর ৬০৭ নং স্টলে, চট্টগ্রাম মেলার চন্দ্রবিন্দু (১২১-১২২),
পাবনা বইমেলা স্টল নং ১৩
সিলেট বইমেলা, স্টল নং ২৩-২৪
খুলনা বইমেলা, স্টল নং ৮৬-৮৭
এবং রকমারি.কম এ
মেলায় মুজিব ইরমের পয়ারপুস্তক ও ইরম পদাবলি

মেলায় মুজিব ইরমের পয়ারপুস্তক ও ইরম পদাবলি


বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে মুজিব ইরমের নতুন কবিতার বই পয়ারপুস্তক ও নির্বাচিত কবিতার সংকলন ইরম পদাবলি।পয়ারপুস্তক বইটি বের করেছে চৈতন্য। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী মাসুক হেলাল। বইটি পাওয়া যাচ্ছে চৈতন্যের ৫৫০-৫৫১ নং স্টলে। ইরম পদাবলি বের করেছে চন্দ্রবিন্দু। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী মোস্তাফিজ কারিগর। বইটি পাওয়া যাচ্ছে চন্দ্রবিন্দুর ৬০৭ নং স্টলে। ইরম পদাবলিতে মূলত সংকলিত হয়েছে গেলো ৩০ বছরে লিখিত ও প্রকাশিত কবিতাগুলো থেকে নির্বাচিত ও প্রতিনিধিত্বশীল কবিতা। আর নতুন বই পয়ারপুস্তক সম্মন্ধে মুজিব ইরম বলেন: ‘পয়ারপুস্তককে যথারীতি আমি আমার ১৬তম ১ম কবিতার বই বলতে চাই, কেনো না একটা বইই তো আমি লিখতে চাই জীবনভর।আর আমার তো বেদনার শেষ নেই।  আমি তো হাছন করিম রাধারমণের দেশের লোক। কথা ছিলো, আমিও শ্রীহট্টে জন্মে গান বাঁধবো, দোতারা নিয়ে ঘুরবো হাওরে-বাঁওড়ে। সিলটি জবানে, নাগরী হরফে লিখবো পুঁথি ও পয়ার। মালজোড়া, পীরমুর্শিদীর টানে ঘরহারা হবো, নারীছাড়া, সংসারছাড়া হবো! গাইবো বন্ধুয়ার সুরত। এসব কিছুই হলো না! কবিতা কবিতা করে বাড়িছাড়া, দেশছাড়া হলাম। তবুও কি কবিতার দেখা পেলাম! লিখতে পারলাম কবিতা, অধরা সুরত!

এই হাহাকার, কবিতা লিখতে না পারার হাহাকার, গান ও সুর বাঁধতে না পারার হাহাকার থেকে, বেদনা থেকে লিখেছি এই সব কবিতা, এই পয়ারপুস্তক। যখনই পয়ার লিখতে বসি, সেই পয়লা পুস্তক থেকে আজ পর্যন্ত, মনে হয়, এই লেখাগুলোই মূলত নিজের জন্যে লিখছি। আর সব লিখেছি, লিখছি অন্যের জন্যে। আর এসব ভাবতে ভাবতে লিখতে থাকি পয়ার, লিখতে থাকি নিজের জন্যে কতো কিছু না-লিখতে পারার বেদনা। মনে হয় এই বইটি নিজের। আর সব পরের। অন্য বইগুলো লিখতে না পারলে আফসোস থাকতো না, কিন্তু পয়ারপুস্তক লিখতে না পারলে আফসোস থাকতো জীবনভর।’

মুজিব ইরম-এর জন্ম মৌলভীবাজার জেলার নালিহুরী গ্রামে। পারিবারিক সূত্র মতে ১৯৬৯, সনদপত্রে ১৯৭১। পড়াশোনা করেছেন সিলেট, ঢাকা ও যুক্তরাজ্যে।

তাঁর ১ম কবিতার বই ‘মুজিব ইরম ভনে শোনে কাব্যবান’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৬ সালে, বাংলা একাডেমি থেকে। তাঁর প্রকাশিত অন্যান্য কবিতার বইগুলো হচ্ছে: ইরমকথা ১৯৯৯, ইরমকথার পরের কথা ২০০১, ইতা আমি লিখে রাখি ২০০৫, উত্তরবিরহচরিত ২০০৬, সাং নালিহুরী ২০০৭, শ্রী ২০০৮, আদিপুস্তক ২০১০, লালবই ২০১১, নির্ণয় ন জানি ২০১২, কবিবংশ ২০১৪, শ্রীহট্টকীর্তন ২০১৬, চম্পূকাব্য ২০১৭, আমার নাম মুজিব ইরম আমি একটি কবিতা বলবো ২০১৮, পাঠ্যবই ২০১৯, পয়ারপুস্তক ২০২০।

কবিতা ছাড়াও মুজিব ইরম কাজ করেছেন গল্পে, উপন্যাসে, শিশুসাহিত্যে। তাঁর প্রকাশিত উপন্যাস/আউটবই: বারকি ২০১১, মায়াপীর ২০০৯, বাগিচাবাজার ২০১৫। গল্পগ্রন্থ: বাওফোটা ২০১৫। শিশুসাহিত্য: এক যে ছিলো শীত ও অন্যান্য গপ ২০১৬। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস: জয় বাংলা ২০১৭।

এছাড়া প্রকাশিত হয়েছে ধ্রুবপদ থেকে মুজিব ইরম প্রণীত কবিতাসংগ্রহ: ইরমসংহিতা ২০১৩, বাংলা একাডেমি থেকে নির্বাচিত কবিতার বই: ভাইবে মুজিব ইরম বলে ২০১৩, এন্টিভাইরাস পাবলিকেশনস, লিভারপুল, ইংলেন্ড থেকে নির্বাচিত কবিতার বই: পয়েমস অব মুজিব ইরম ২০১৪, ধ্রুবপদ থেকে উপন্যাসসমগ্র: মুজিব ইরম প্রণীত আউটবই সংগ্রহ ২০১৬, পাঞ্জেরী থেকে: প্রেমের কবিতা ২০১৮, বেহুলা বাংলা থেকে: শ্রেষ্ঠ কবিতা ২০১৮, চন্দ্রবিন্দু থেকে: ইরম পদাবলি ২০২০।

পুরস্কার: মুজিব ইরম ভনে শোনে কাব্যবান গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি তরুণ লেখক প্রকল্প পুরস্কার ১৯৯৬। বাংলা কবিতায় সার্বিক অবদানের জন্য পেয়েছেন সংহতি সাহিত্য পদক ২০০৯, কবি দিলওয়ার সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪। কবিবংশ গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন ব্র্যাক ব্যাংক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪। শ্রীহট্টকীর্তন গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন সিটি-আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার ২০১৬। মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ‘জয় বাংলা’র জন্য পেয়েছেন এম নুরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার ২০১৭। কবিতা ও কথাসাহিত্যে সার্বিক অবদানের জন্য পেয়েছেন শালুক সাহিত্য পুরস্কার ২০১৯। এছাড়া পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ পুরস্কার ২০১৭।
নশ্বর, শ্মশান, তৃণ, নক্ষত্র ও শেষ ট্রেন • মণিশংকর বিশ্বাস

নশ্বর, শ্মশান, তৃণ, নক্ষত্র ও শেষ ট্রেন • মণিশংকর বিশ্বাস






নশ্বর

কোথাও যেও না তুমি
আমার হৃদয়ে থাকো।

চার্চদিনে ভোরবেলা যে-রকম ঘণ্টা পড়ে
সেই মত কাঁপা কাঁপা জল, জলের ও-পারে
নীল, নীলাভ জঙ্গল, আর বাঁশির সুরের মত
একটানা পথ; কতদূর যাওয়া যাবে এই পথে ?
প্রশ্ন করি আর দেখি, রেশম চাষির পাগড়ির মত
আকাশে উজ্জ্বল মেঘ, দুটি মেঘের মধ্যবর্তী সেতু—
একটি পাখির ঝাঁক…

এই ধর্মবোধ।

শ্মশান

ভালোবাসি— এই স্বতঃপ্রণোদনা যেরকম
তার চেয়ে কিছু কম গভীরতাময় ইঁদারার জলে
ঝুঁকে দেখা গেল চাঁদ, থমকে রয়েছে
যেন অদূরে বিজয় দেখে ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে
রোমাঞ্চবিহীন গৌড়-বাংলার শেষ ঘোড়সওয়ার,
আর কুয়াশায় কেঁপে কেঁপে ওঠে চন্দ্রমল্লিকা
যেন আমাদের বোনের হৃদয়—
চাঁদের আলোর মত কাছেই দূরের পাহাড় দেখে
বিহ্বল লাগে—‘দেবতার মল্লযুদ্ধ’, এই নামে
ছোট কোন হাওয়া এসে দোলা দেয় করবীর শাখা।
কোন এক সরল ঐকিক নিয়মের বশে
ফুলে ফুলে ভরে গেছে শালের জঙ্গল।
এইখানে রাত্রি এক মাকড়সা, আর তার আঁধারের
জালখানি ন্যস্ত রয়েছে সর্বত্র, সকল নশ্বর ফুল ঘিরে…

অনেক তারার নীচে দাঁড়িয়ে রয়েছি

শাদা মেঘের মত ফাঁকা করতল।

জানি অদূরেই তুমি আছ।

তৃণ

মৃত্যুর পরেও আরো ক’টা দিন আমি
আমি বেঁচে থাকবো।
সন্ধ্যাতারা ভোরের শেফালী হ’য়ে
যে-রকম ছুঁয়ে থাকে মাটি।

দূর হতে আমাকেও ডাকে, ওই পারে…

প্রতিটি শেফালীর পাশে...

মরণ রে, তুঁহু মম…

তুমি ঘন নীল অথবা সোনালী
অলৌকিকতা
এখনো শুয়ে আছো
ধাবমান কার্তুজের খোলে

পাখির ঝাঁকের প্রতি—

একটি পাখির টানে…

নক্ষত্র

যাকে এতক্ষণ গুপ্ত-ঘাতক মনে হ’য়েছিল
কাহিনীর শেষে বোঝা যায় সে আসলে
ভালো মানুষের পো

অল্প অল্প বৃষ্টি হচ্ছে, সরলাবালা বালিকা বিদ্যালয়ের মত

ভিজে আকাশের নীচে খুব আস্তে
ফুটে উঠছে এক দুঃখী রাজপুত্র, একা, অবুঝ…

শেষ ট্রেন

শালবন আর সূর্যাস্তের কাছে তোমাদের হলুদ রঙের দোতলা বাড়ি।

তোমার মনের কাছে এখন-কি অন্য কেউ বসে আছে?
এসব লেখার অর্থ কী তবে?
কাচফুল— রক্তমাখা তারকাটা— অতিদূর শ্রাবণের মত নীল
তোমার দুচোখে একটি বা দুটি তারা ফুটে ওঠে।
তাদের ভিতর জেগে উঠছে রাত্রির অসামান্য আয়োজন—
এর কিছুটা আমার নিজস্ব।

প্রতিদিন তোমাকে হাতের মুঠো থেকে বের করে দিই
অন্য অনেক তারার মত আমিও জেনেছি
এ-পথ আমার, একার—

একা একাই বাড়ি ফিরে যাব রাত বারোটা পাঁচের বনগাঁ লোকাল ধরে…


মণিশংকর বিশ্বাস
জন্ম: ১৯৭২, ৩-রা ডিসেম্বর (ঠাকুরনগর, উত্তর ২৪ পরগনা)। ১৯৯৬-৯৭ সাল থেকে গান্ধার পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। পত্রিকা বলতে মূলত কফিহাউস-কেন্দ্রিক আড্ডা। ১৯৯৮ সালে গান্ধার থেকেই প্রথম সংকলন (ফোল্ডার), "নম্র বৈশাখী ও নীলিমার অন্যান্য আয়োজন"। স্বল্পকালের জন্য সম্পাদনা করেছেন "জড়ভরত", মূলত গান্ধারেরই উদ্যোগে।

প্রকাশিত বইঃ "চন্দনপিঁড়ি" (কবিতা, ২০১৪) "অশ্রুতরবার" (কবিতা, প্রকাশিতব্য)

বর্তমানে সিডনি, অস্ট্রেলিয়াতে বাস করেন।

গল্প • রাদো ঘড়ি • হামিম কামাল

গল্প • রাদো ঘড়ি • হামিম কামাল


১.

কে যেন অনশন করে মারা গিয়েছিল। যা চেয়েছিল পায়নি। আমার শৈশবের স্মৃতি এটা। কিন্তু এই এটুকু ছাড়া আর কিচ্ছু মনে নেই যেটা বলে কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারি। সেই প্রথম অনশনের সঙ্গে আমার পরিচয়। মনে আছে, অনশনকারী একজন নারী ছিলেন। মাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ও না খেয়ে আছে কেন? মা আমাকে বুঝিয়েছিলেন, না খেয়ে ও আমাদের ওপর ভরসা করছে। এবার যেন আমরা ভালোবেসে ওর চাওয়াটা মেটাই। অনশনটা সবচেয়ে কোমল আন্দোলন। যাদের কাজের বিরুদ্ধে আন্দোলন তাদের ভালো মানুষ ধরে নেওয়া হয়। যেন ওর না খেয়ে থাকায় ওদের অনেক কিছু এসে যায়। কখনো সত্যিই এসে যায়, কখনো কিছু এসে যায় না। আমি মায়ের কথা কিছু বুঝতে পারছিলাম না। কিছু পারছিলাম। যেটুকু পারছিলাম সেটুকু বোঝার গৌরবে চুপ থাকলাম। কিন্তু যেটুকু বুঝলাম না সেটুকু লালন করে রাখলাম কখনো আর কাউকে জিজ্ঞেস করব। পরে মেয়েটা যখন মারা গেল, আমি এটুকু নিশ্চিতভাবে জেনেছিলাম, যাদের কাছে সে দাবি তুলেছিল, তার মৃত্যুতে তাদের কিছু যায় আসে না। আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম, মেয়েটা কি তা জানত না? 

২.

কী একটা যেন চেয়েছিলাম মায়ের কাছে। পাইনি। কী পাইনি খেয়াল নেই। কিন্তু সেই না পাওয়াটা আমাকে স্বপ্ন থেকে বাস্তবে অনেক ভুগিয়েছিল। স্বপ্নে আমি শুধু লম্বা লম্বা পথ হেঁটে হেঁটে লম্বা লম্বা কথা বলে গেছি ধূসর সব মুখের দিকে তাকিয়ে। কিছু একটা খোঁজে যেন আমাকে পাহাড় ডিঙাতে হবে, ঠিকানা জানা নেই, কেউ আমাকে ঠিকানাটা দিচ্ছিল না। একটার পর একটা বাধা এসে আমাকে কেবল সরিয়ে নিচ্ছিল। সব হচ্ছিল, কেবল যা চাই সেটাই হচ্ছিল না। আর বাস্তবে আমি খুব মনমরা হয়ে থাকলাম। আমার বন্ধু, মনে মনে যাকে ভালো বাসতাম আমি, এসে বারবার জিজ্ঞেস করে গেছে, ‘তোমার কী নিয়ে মন খারাপ?’ আমি বলিনি। শেষে সে বলেছে, আমাকেও সে কোনোদিন কিছু বলবে না। আমি তখন আর থাকতে পারিনি। তাকে ডেকে বলেছি, ‘শোনো, তুমি মন খারাপ কোরা না। আসলে কী একটা যেন আমাকে দেবে বলেছিল আমার মা, দেয়নি। তাই মন খারাপ। আবার, সেই জিনিসটা যে কী, সেটা মনে করতে না পেরেও আমার মন খারাপ। শুনলে তো। এবার বলো, কী করব। কিভাবে আমার মন ভালো হবে।’ আমার বন্ধুটি হেসে চুপ করে আমার পাশে বসেছিল। তার কাছে কোনো সমাধান ছিল না।

৩.

কাকে যেন কারা মেরে ফেলেছে, পত্রিকায় তার ছবি। আমার বাবা ছবিটা দেখে পত্রিকা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন। আমি বসেছিলাম অপরপাশের চেয়ারে। খানিকটা উঠে এসে ঝুঁকে তাকিয়ে দেখলাম ছবিটা। একজন মানুষকে অনেকগুলো মানুষ ধরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। মানুষটার মাথা থেকে সারা শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। আমি আমার বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, মানুষটি কে? বাবার নিরুত্তর। আমি আমাকে মাকে জিজ্ঞেস করলাম, কে মানুষটি? মা নিরুত্তর। আমি মানুষটির নাম উচ্চারণ করে পড়েছিলাম, মনে আছে, কিন্তু কী সেই নাম, তা আর মনে নেই। তবে তখন বেশ ক’দিন মনে ছিল। আমি স্কুলে গিয়ে আমার বন্ধুদের বলেছিলাম মানুষটিকে তারা চেনে কিনা। একজন চিনেছিল, সে আমার সেরা বন্ধু ক্লাসের। এখন দেশের বাইরে কোথাও থাকে। চেনে বলার পর আমি কী বলেছিলাম, সে-ই বা প্রত্যুত্তরে কিছু বলেছিল কিনা আমার মনে নেই। আজকাল অন্তর্জালে পুরনো, হারিয়ে যাওয়া মানুষদের খুঁজে পাওয়া যায়। তাকে পেলে আমি জিজ্ঞেস করব- এরকম কিছু তার মনে আছে কিনা। 

৪.

কে যেন বিদেশে যাবে, আমরা সবাই বিমানবন্দরে ছিলাম। কিন্তু কে সেই লোক, কোথায়ই বা সে গিয়েছিল তার কিছুই আজ আর মনে করতে পারি না। শুধু মনে আছে বিমানবন্দরের বিরাট ছায়ান্ধকারে আমি আমার মায়ের হাত ধরে একবার এপাশে যাচ্ছি, আরেকবার ওপাশে। সবাই জিজ্ঞেস করছে, ‘সে’ এসেছে কিনা। ‘সে’ যাবে বিদেশে, কিন্তু তারই দেখা নেই। সবাই খুব বিরক্ত। কেউ কেউ আবার ভীত। আমাদের না দেখতে পেয়ে সে কাচের দেয়ালের ভেতরে ঢুকে গেল কিনা। বিমানবন্দরের বাইরে অনেক মানুষ, এবং তখন মোবাইল ফোনের যুগও নয় যে এ তাকে ফোন করে খুঁজে বের করতে পারবে। যারা ‘তার’ অপেক্ষোয় ছিল তারা নিজেরাও মাঝে মাঝে একে অপরকে হারিয়ে ফেলছিল। এ অবস্থায় খুবই সম্ভব, যার জন্যে অপেক্ষা সে হতাশ হয়ে দুপাশে মাথা নেড়ে একসময় কাচের দেয়ালের ওপারে চলে গেছে, যেখানে বিরাট একটা উড়োজাহাজ তার অপেক্ষায়। যাওয়ার আগে সে হয়ত বারবার পেছনে তাকিয়েছিল একটা পরিচিত মুখের আশায়, কিন্তু দেখতে পায়নি। বিমানবন্দরের আকাশপ্রতীম বিপুলা ছাউনির নিচে উড়ে বেড়াচ্ছি অগনিত অসংখ্য জালালি কবুতর। সেই মানুষটির দেখা শেষতক পেয়েছিলাম কিনা আমার মনে নেই, সম্ভবত আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, যে গাড়িটা আমরা ভাড়া করে নিয়ে গিয়েছিলাম- একটা নীলরঙা মাইক্রোবাস, তার সিটে গা এলিয়ে। কিছুদিন আগে মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কে সেই লোক যার জন্যে...’ মা নিচের ঠোঁট কামড়ে ভুরু কুঁচকে ভাবতে বসল। এমন কিছু আদৌ ঘটেছিল কিনা সেটাই তার মনে নেই। 

৫.

কে যেন হারিয়ে গিয়েছিল। আমি আমার বন্ধু তালুকদারকে নিয়ে একটা খালের পাশ দিয়ে দৌড়ুচ্ছি। আমরা কি হারিয়ে যাওয়া তাকে খুঁজছিলাম? না। দূরে খালের পশ্চিমধারে এক ডোবাপুকুরর সঙ্গে যোগ, সেখানে কার যেন লাশ ভেসে উঠেছে। কোমরের কাছে ষোল মাছে খাওয়া। এতো কিছু আমার মনে আছে, কিন্তু কে হারিয়ে গিয়েছিল আর কার লাশই বা আমরা দেখেছিলাম, আদৌ দেখেছিলাম কিনা, কিছুই মনে নেই। 

৬.

কৈশোরে একবার দাদুবাড়ির পুকুরপাড়ে কার সঙ্গে যেন বসে মিষ্টি সব আলাপ করেছিলাম। তার মুখটা শ্যামল, চোখ দুটো টানা টানা, কণ্ঠ খানিকটা ছেলে ছেলে ভাঙা ভাঙা, শুনতে আমার ভালো লেগেছিল। একটাই সন্ধ্যা কেবল, পুকুরপাড়ে আমার পাশে বসে অনেক কথা সে বলেছিল। ঢাকা থেকে গিয়েছিলাম দাদার বাবার জন্মবার্ষিকী পালনে, বা মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর জন্ম ও মৃত্যু একই দিনে, ৯ ফাল্গুন। ঢাকায় থাকি বলেই বোধয় মেয়েটি আমার সঙ্গে সাধ্যমতো প্রমিত রীতিতে কথা বলছিল। মনে মনে তার সঙ্গে বুঝি প্রেম হয়ে গেল ভেবে সুখ সুখ পাচ্ছিলাম, আমি বরাবরই প্রেমিক প্রকৃতির। মেয়েটির সঙ্গে সারা দুপুর, বিকেল, সন্ধ্যা থেকে রাত অব্দি অসংখ্য রোমাঞ্চকর মানসিক লেনাদেনা হয়ে গেল। অনুষ্ঠান শেষ হলো, আমার সেই আত্মীয়াও চলে গেল। পরের বছল নাম ভুলে যাওয়া তার ছায়া ছায়া তার মুখের গড়ন, কথার বর্ণনা আমি পরে অনেকবার দিয়েও কারো কাছ থেকে তার পরিচয়টা পাইনি, কেউ চেনেনি তাকে। আর কখনও তার সঙ্গে দেখা হয়নি আমার।

৭.

দেয়ালের ওপর বসে পা দোলাতে দোলাতে কে যেন আমাকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তোমার আপার নাম পাখি, তাই না?’ ছেলেটা বয়সে আমার বড়, তাকে আজও চিনতে পারি না। ছেলেটা আমার হাত দুটো তুলে নিয়ে বলেছিল, ‘কী নরম!’ মেজাজ খারাপ হলেও আমি হাসলাম। সবচেয়ে শোচনীয় অংশটা ঘটল এরপর। ছেলেটা বলল, ‘তোমার আপার হাতও কি এমন নরম?’ তখনও আমি হাসলাম, সেই লাজুক লাজুক সুখী সুখী হাসি। আমার পিঠ চাপড়ে ছেলেটা জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কিছু খাবে?’ আমি তার হাত গলে বেঁকে বেরিয়ে যেতে চাইছিলাম । কে সেই গোপন পাণিপ্রার্থী আমার বোনের? আমার বোন তখন প্রথম তারুণ্যে পা দিয়েছিল, আর সেও ছিল প্রথম তরুণ। আমি শেষ কৈশোরে।

৮.

কে যে আমায় কী যেন খেতে শিখিয়েছিল, অচিন গাছের নচিন কোনো ফল। আমার প্রথম গ্রামীন বন্ধু সে, এটুকু জানি। নানাবাড়ির সবুজ অন্ধকারে সারা দুপুর দুজন বিভূতিভূষণের গল্পের পাতায় যেন দৌড়ুলাম। সোনালী হলুদ-পাটকিলে এক অদ্ভুত রহস্যগন্ধা বিকেল। শহরে ফিরে এসে তার মুখ ভুলে গেলাম। এরপর দেখা হয়নি প্রায় চব্বিশটি বছর। অনেক অনেক দিন পর শুনেছি, কে যেন পাগল হয়ে গেছে গাঁয়ে, আমার নাকি বন্ধু ছিল সে, প্রায়ই এসে জিজ্ঞেস করত আমার কথা। নাম মনা। মনাই কি আমাকে... আমি মনে করতে পারলাম না। যদি সে-ই হয়ে থাকে তো... পুলকিত মন, আমি ভুললেও হয়ত সে ভোলেনি। তাকে যেদিন দেখতে যাব, শুনি পালিয়ে গেছে। পাগল পালিয়েছে, কে আর রাখে খোঁজ। সেবছর গেল। পরের বছর আবার গেলাম গাঁয়ৈ। মনে মনে কল্পনার কত জাল, যেন তার দেথা পাব, বোধয় সে-ই, এ-ই সেই, আমার সেই বন্ধুবর, গুঁড়োমরিচ আর লবণ মাখিয়ে খেতে শিখিয়েছিল সেই বুনো ফল। কিন্তু কোথায় কে। সে ফিরে আসেনি। পরের বছর নয়, তার পরের বছরও নয় হয়ত আর কোনোদিনই আসবে না। তার পরিবারও আশা ছেড়েছে। মনাকে যদি দেখতে না পাই, কোনোদিন জানতে পারব না ও আমার সেই বন্ধুটি কিনা। ভুলে যাওয়া এক মধুমধ্যাহ্নের অযাচনার বর-বিভূতিভূষণ।

৯.

কিন্তু একটা রাদো ঘড়ি আমার পাওয়ার কথা ছিল, মনে করতে পারি। বাবা কথা দিয়েছিলেন। তবে একটা শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন— ক্লাসে প্রথম হতে হবে। প্রথম আমি কোনোদিন হতে পারিনি। বাবাও সেই গ্লানি নিয়ে একদিন ছবি হয়ে গেলেন। ঘড়ি আমার পাওয়া হলো না। এখন মাঝে মাঝে মনে হয়, বাবা যা দিতে চেয়েছিলেন তা যেন ঠিক ঘড়ি ছিল না। আমিও বাবার কাছ থেকে ঘড়ির আড়ালে যেন অন্য কিছু চেয়েছিলাম। 



হামিম কামাল
জন্ম: ৯ অগাস্ট ১৯৮৭, ঢাকা। 
প্রকাশিত বই: জঠর (২০১৫), কারখানার বাঁশি (২০১৮), সোনাইলের বনে (২০১৯)।
সিলভিয়া প্লাথ, কাফকার সম্মোহনী ও অন্যান্য • তিয়াশা সুরভী

সিলভিয়া প্লাথ, কাফকার সম্মোহনী ও অন্যান্য • তিয়াশা সুরভী






সিলভিয়া প্লাথ

জলের সাথে মিলেমিশে রক্ত গড়িয়ে গিয়ে সকালের পবিত্র আলো ছুঁয়ে দেয়। সে সময়ের সাথে সংঘর্ষ চলছে মানুষের।
মানুষ!
মানুষ কি চেনে অন্য মানুষকে?
মানুষের হাত, পা, চুল, প্রিয়তম চোখ এসকল যেন ভুল আয়াত হয়ে ঢুকে গেছে ইতিহাসের পাতায়।

মেয়ের লাশ শেষ বার দেখে হাত রাখে কফিনে।
সেই অতি প্রয়োজনীয় অথচ অপ্রিয় কফিন একজন বাবা বয়ে বেড়ায় চিরকাল।
ভাবে- এ হাত গড়েছিল একদিন সভ্যতার প্রাচীর
এ হাত এখন কিয়ামতের অপেক্ষা ছাড়া নিজের বিরুদ্ধেও দাঁড়াতে পারে না।

আত্মহত্যার রঙ না কথিত সভ্যতার ব্লেডের ধার বেশি সুন্দর ?

সিলভিয়া প্লাথ, আপনার কবিতায় প্ররোচিত হয়ে কোন মানুষ কি মরেছিল? খুব সকালে?

কাফকার সম্মোহনী
নগ্ন সত্য আর মিথ্যের মাঝামাঝি মৃত্যু বেছে নেয়া কঠিন।

তবু
কবরে পৌঁছানোর রাস্তা দেখানো হচ্ছে।
আমার ডায়েরি আর স্ট্যানলির চিঠি গুলো সাথে দিতে বাধ্য করেছি।
ঠিক এই মুহুর্তে, চারজনের কাধের ওপরে শুয়ে, ঘুম ঘুম চোখে বুঝতে পারছি, স্ট্যানলিকে অনুবাদ করলে স্ট্যানলিই থাকে।

আমার মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে দুঃখ মেশানো হাসি। কার হাসি এতোটা তীক্ষ্ণ!
সে কি জানে আমি আর কবিতা লিখতে পারবো না, শ্লীল অথবা অশ্লীল শব্দে? আমাকে উপহাস করছো। আমার রেখে যাওয়া প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা বাক্য, প্রতিটা কবিতা তোমার স্বেচ্ছামৃত্যু ডেকে আনবে, আমি বিশ্বাস করেই আরামে শুয়ে আছি এখন।

ফরাসিরা একবার কাফকা পুড়িয়ে ফেলতে চেয়েছিল। অথচ কাফকার বানানো জগতে আমি রোজ বিকেলে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতাম। এখন একসাথে বসে সিগারেট ভাগাভাগি করতে পারবো ভাবতেই আরো দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে চাচ্ছি।

স্ট্যানলি,
আমাকে, এই আমার আমিকে নির্মাণে অথবা কাফকার কাছাকাছি পৌঁছে দেয়ায় ভূমিকা আছে তোমার একান্ত ব্যক্তিগত স্যুভেনিরের। অবশ্য তুমি আমাকে সম্মোহিত করনি। তবুও
তুমি ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিও ট্রাফিকের তিন রকম আলো। (যদি পারো)

রেস্তোরা

নবী মূসা
অনেক মানুষের ভীড়ে
আপনার হাতটা যখন ছাড়লাম
পৃথিবীর ওজন বাড়িয়ে চাপিয়ে দেয়া হলো আমার ঘাড়ে।
ঘাড়ের তিলে চুমু খেয়েছিল যে, তাকে পাওয়া যাবে কফির দোকানে। চিনির দাম কম না বেশি এই নিয়ে আলোচনা চলছে তুমুল। এসব খুচরো আলোচনার সুবিধার্থে শহরে এতো দামী, কম দামী ক্যাফে, রেস্তোরাঁ।

ব্যাক্তিগত ঠোঁট থেকেই কেবল আমি চা পান করি। খেতে খেতে নতুন চশমাটা পরে শরীরের সমস্ত বাক দেখার আগেই অর্গাজম হয় কবিতার, কবিতায়!

বীর্যভেজা পাতার গন্ধে আমি লিখতে পারি না।

ভুল ঘুম

তীরবিদ্ধ বুক।

বুকের সমস্ত ভালোবাসা জড়ো করে, তোমার প্রাক্তনের জন্য বসে আছি, আজ দেড়শত বছর।

তোমার মুখোমুখি, আমি। অথচ মরে গিয়েছি গতরাতে সিগারেটের শেষ টানের সাথে।

মহাকাল থেকে অতীত ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় আমার শীত করছে।

প্রেমাতালের ওষুধ খেতে ভয় আমার। ভয়ংকর চোখ এখনো ছবিটায়। ধূসর হয়ে যাচ্ছে ধীরগতিতে ইতিহাসের আয়াত।

আর

নূর দেখেছিলাম যে চোখে সে চোখ পুড়ে যাচ্ছে ভুল ঘুমে।


ক্ষুধার্ত মানুষের গান

একদিন হাটতে হাটতে আমি চলে গিয়েছিলাম বব মার্লের তাবুতে। উনি গান লিখে আমাকে গেয়ে শোনালেন। দুঃখ দুর্দশা আর ক্ষুধার্ত মানুষের গান।
কতোকাল হাটতে থাকলে আমার বয়সের সমান ক্ষুধায় আমি নিজেকে আবিষ্কার করতে পারবো বব?

এক কেজি করলার দাম আমি রেখে এসেছি বালিশের নিচে। চালের দাম? কিনি না তো। রাত হলে ভাতের হোটেলের সামনে বসে থাকি। বসেই থাকি। যখন ক্ষুধায় তৃষ্ণায় চোখে ঝাপসা দেখি আমি চলে যাই কোন আখড়ায়। গান শুনি। শুনি বেকারত্বের হার কমে গিয়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

বসন্ত শেষ। এখন বর্ষাকালীন কদম সময়।
প্রচন্ড বৃষ্টি শুরু হয়
ভিজে যায় অসহায় রাত
ঘুমহীন লাল চোখ, অবহেলায় পকেটে রাখা দু'টাকার কয়েন
খামছে ধরে বুকের ভেতরকার তীব্র ক্ষুধা।

হে
দিকভ্রান্ত কবি
চিরকাল মাতাল আপনি
ছিলেন সেখানে?
বিভ্রমের সঙ্গম শেষে জ্বলে গেলো ক্যাটালগ
ইবাদত ব্যতিত আগুনে জ্বলে যাওয়া পাপ
আপনি বিশ্বাস করতে পারেন, আপনার ইবাদতের সাক্ষী মরে গিয়েছে আপনার মৃত্যুর আগেই।
তবে স্পষ্ট ঈমান আনুন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রের।
নিজের লাশ আর কতোকাল কাঁধে বয়ে বেড়াবেন?

আমি আপনার ভাবনা, ভাবনা অব্দি না এনে, হেঁটে যেতে চাই ভ্রান্তিময় সময়ে। সময় যেখানে কবিতা, কবিতা যেখানে সময়। ওখানে চুমু খেতে প্রশ্ন প্রশ্ন খেলায় আমার আগ্রহ নেই। আগ্রহ আছে টকটকে লাল ঠোঁটে। দীর্ঘতম চুমুর রক্ত আমি হাটবাজারে বিক্রি করে ট্রেনে চেপে বসবো।

কারণ
বব জানালো -
বৃষ্টি থেমেছে
ম্যাপল পাতা ভিজে গেলে নরকের আগুন নিভিয়ে দেয়া হয়।
ঘুমোতে দেয়া হয় রাত প্রহরীকে।
বিভ্রান্তিকর অস্থিরতার কথা কেউ আর অনেকদিন বলে না।

বব, ক্ষুধা পেটে সিগারেট আমার দারুণ লাগে
লাইটার হবে?
নরকের আগুনটা, বড্ড মলিন।
সিগারেট ধরানোর মতো মহৎ কাজে লাগে না।
এগুলো বলার সময় এখন আমার হবে না।

করলা। করলা কিনে বাসায় ফিরতে হবে।
লাল গোলাপ পাশে নিয়ে ঘুমাতে হবে।
মানুষ মানুষকে মারছে এসব খবর না শুনে ঘুমাতে গেলে গোলাপের গন্ধ প্রাক্তনের কথা মনে করায়।
আমি চিৎকার করে 'দিকভ্রান্ত কবি' কে ডাকতে গিয়েও কোনদিন ডাকিনি, জানেনি কেউ, বলবো না তাঁর কথা কাউকে কখনোই।

বিষন্ন সুরে ক্ষুধামুক্তির কোন গান হবে নাকি, বব?


"Don't Worry
About a Thing
Cause Every Little Thing gonna be Alright"
গল্প • চ্যাটিং • সত্যজিৎ বিশ্বাস

গল্প • চ্যাটিং • সত্যজিৎ বিশ্বাস


(এক) 

-আমি সাদিয়া ফারজানা একা। অপরিচিত কারো সাথে এই প্রথম চ্যাট করছি। বলেন তো কেন? 
-- কেন? 
- আপনার লেখা আমার খুব ভালো লাগে। আপনি এত ভালো লেখেন কি করে সেই রহস্য জানতে। 
-- রহস্য অতি সাধারন। একসময় প্রচুর প্রেমপত্র লিখতাম তো, সেই থেকেই। 
- ভাইয়া কি আমার সাথে ফান করছেন? 
-- কী বিপদ, ফান করবো কেন? সত্যিটাই তো বললাম। আজকাল সত্যি কে মানুষ ফান ভাবে আর ফান করলে ভাবে সত্যি। তাই না? 
- কী জানি ভাইয়া, আমি এত বুঝিনা। 
-- না বুঝলে চলবে কি করে? 
- মানে কি? কী চলবে কি করে? 
-- বললাম, না বুঝলে কথা চলবে কি করে? 
- ও, তাই বলেন। 
-- তাইই তো বলছি। এই যে এতগুলো কথা বললাম, এরমধ্যে কোনো মজার ব্যাপার কি বোঝা যায়নি? 
-ভাইয়া কী যে বলেন? এরমধ্যে বোঝার কি আছে? 
--অবশ্যই আছে। একটু খেয়াল করলেই বোঝার কথা। 
-ভাইয়া, আমি কিন্তু বাচ্চা মেয়ে না। এই ছোট্ট পুরো কনভারসেশনটা দু’বার পড়লাম। এখানে বোঝার কিছুই নেই। আপনি আমাকে নিয়ে ফান করছেন। এটাই মজার। 
--হা, হা, হা... সেই কথাই তবে আবার বলি, আজকাল সত্যি কে মানুষ ফান ভাবে আর ফান করলে ভাবে সত্যি। কী অদ্ভুত, তাই না? 
-আপনি কিন্তু আমাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। 
--যদি সত্যি হয়? 
-যদি সত্যি আমাদের এই চ্যাটিং এ মজার কোনো ব্যাপার থেকে থাকে তাহলে আপনাকে একটা বর দেবো। ওই যে দেবতা যেমন বর দেয়, তেমন বর। 
--ঠিক তো? 
- খুব ঠিক। বলেন শুনি কি মজার ব্যাপার আছে? 
--এতক্ষন ধরে আমরা যে চ্যাটিং করলাম, আমি কি একবারো সাদিয়া ফারজানা একা-কে আপনি কিংবা তুমি কোনো কিছু সম্বোধন করে কিছু বলেছি? একটা মানুষের সাথে পরিচয়ের শুরুতেই কি মানুষ তাই করেনা? 
-ওমা তাইতো? এত সহজ কিন্তু ধরতে পারলাম না কেন? ভাইয়া, আপনি তো আসলেই ... ... 
--আসলেই কি? বিশেষণ বিহীন? হা, হা, হা... 
-সত্যি বলছি ভাইয়া, এতটা অবাক আমি কখনো হইনি। বলেন কি বর চান? 
--হা,হা,হা... আজ না, আরেকদিন... আজ টা টা 
-বাই ভাইয়া, ভালো থাকবেন। 
--খুব চেস্টা করবো। বাই। 

(দুই) 

-ভাইয়া কি অন লাইন? 
--হুম, এখনো লাইন থেকে ছিটকে পড়িনি। 
-হা, হা, হা... আপনি কি সবার সাথে এভাবেই কথা বলেন? 
--সবার সাথে বলি না, তো। একার সাথে একা বলি। 
-একার সাথে মানে? আমার সাথে? 
--একার সাথে মানে নিজের সাথে। 
-উফ... আপনি কি আমাকে বাচ্চা মনে করেন? 
--মনে করবো কেন? তাইতো। 
-জ্বী না। আমি তেইশ পার হয়ে চব্বিশে পড়বো পড়বো করছি।  
--তাহলে তো আপনি অনেক বড়। 
-এই প্রথম আপনি আমাকে কিছু একটা সম্বোধন করলেন। 
--হা, হা, হা... করবো না তবে? 
-করবেন, অবশ্যই করবেন। তবে তুমি করে বলবেন। 
--আচ্ছা বলবো। কি নামে ডাকবো তোমাকে? 
-এটা আবার কেমন কথা? আমার নাম যা, সেই নামে ডাকবেন। 
--তোমার তো তিনটা নাম তাই জিজ্ঞাসা করলাম। 
-আমার তিনটা নাম? 
--তাইতো। ‘সাদিয়া’ ‘ফারজানা’ ‘একা’। 
-ভাইয়া, আপনি কিন্তু আমার সাথে পরিচয়ের প্রথম দিন থেকে বাচ্চাদের মতো ফান করছেন। আমার তিনটা নাম না, একটাই নাম। 
-- আচ্ছা বেশ। তাই যদি হয়, তাহলে নামে ভুল আছে। 
-নামে ভুল আছে মানে? কোথায় ভুল? 
--তাহলে তুমিই বলো- সাদিয়া আর ফারজানা, একা হয় কি করে? 
-হা, হা, হা ... আপনি পারেনও। তবে সাদিয়া ফারজানা একা শুধু না, এ জগতে সবাই একা। 
--তাই কি? এ ঢাকা শহরের লোকসংখ্যা দেড় কোটি পার হয়েছে অনেক আগে। বাসায়, রাস্তায়, অলিতে-গলিতে, শপিং মল কিংবা বাজারে হাজার হাজার মানুষ। 
-তাতে কি? হাজার ভীড়েও কি মানুষ একা হয়না? 
--প্রযুক্তির যুগে এ-যুক্তি ধোপে টেকে? একা হবার সময় কই শুনি? মোবাইল, অন লাইনে ই-মেল, ফেসবুক, ভাইবার, হোয়াটস এপ... ... রেডিও-টেলিভিশনের একশ একটা চ্যানেল, এইদিবস, সেইদিবস, বিশাল বিশাল লাইভ কনসার্ট- মানুষকে কি করে একা থাকতে দেয় শুনি? পাঁচ মিনিটের জন্যও কী সবার সাথে, সব কিছুর সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারছো? 
-তা অবশ্য ঠিক। 
--একা হওয়ার সব পথ এ শহরের মানুষ হারিয়ে ফেলেছে। এটা এখন যান্ত্রিক শহর। মোরগ কিংবা পাখীর ডাক এখন আর এ শহরের মানুষের ঘুম ভাঙায় না,ঘুম ভাঙ্গায় এলার্ম ক্লক। 
-হুম বুঝলাম। 
--কি বুঝলে? 
-আপনি কথার যাদুকর। 
--ওরে বাবা, এত্তো বড় এওয়ার্ড? কোথায় যে রাখি? 
-রাখার জায়গা নেই বুঝি? সব ভর্তি? 
--হুম। সব। যাই এখন তবে একটা সেলফ বানাতে অর্ডার দিতে যাই দোকানে। 
-আমার কথার জন্য? 
--তোমার কথার জন্য হতে যাবে কেন? আমার এওয়ার্ড রাখার জন্য। 
- আপনি মানুষকে এত ইনসাল্ট করতে পারেন? 
-- ইনসাল্ট করলাম কই? সত্যিটা বললাম মাত্র। বাই তবে। 
- আপনি একটা যা ইচ্ছে তাই। বাই। 

(তিন) 

-হ্যালো 
--কোন দিকে হেলবো? 
-হা,হা,হা... কোন দিকে হেলতে ইচ্ছে করছে আপনার? 
--যার সাথে চ্যাট করছি তার দিকে। 
-ইসস...ইচ্ছে করলেই হলো? 
-ইচ্ছে না করলে হয় কি করে? 
--শুনুন লেখক সাহেব,এসব ইচ্ছা ভালো না। 
-ভালো না কেন, শুনি? যদি বোঝাতে পারো এসব ইচ্ছা কেন ভালো না, তাহলে আমাকে দেয়া তোমার বর ফিরিয়ে দেব। 
-আর যদি না পারি? 
--তাহলে আরো একটা বর দিতে হবে। 
হা, হা, হা... আপনি একটা পাগল। 
-কে না? এবার বলো, এসব ইচ্ছা ভালোনা কেন? 
--ওমা, আপনি কেন আমার দিকে হেলতে চাইবেন? 
-আমার ইচ্ছা হলো বলে। যে কোনো সৃষ্টির প্রথম শর্তই কি, ইচ্ছা না? আজ এত কিছু যে আবিষ্কার- তার মূলে কি ইচ্ছা না? 
--তা হয়তো ঠিক। কিন্তু আমি তো একটা মেয়ে। আমার প্রতি এমন ইচ্ছা হওয়া টা ঠিক? 
-ইচ্ছার আবার ছেলে-মেয়ে কি? আচ্ছা- তোমার কোনদিন কোনো ব্যাপারে ইচ্ছা জাগেনি? 
--জাগবে না কেন? 
-তাহলে? ইচ্ছে হতে কি মেয়ে বা ছেলেতে বাঁধা আছে? 
--তা নেই, কিন্তু... 
-কিন্তু একটাই। আমার ইচ্ছেটা তোমার ইচ্ছে হচ্ছেনা। তাই তো? 
--আপনি বড্ড ঠোঁট কাটা। হুম তাই। 
-তাহলে সেটা বললেই তো পারতে। কেন বললে- এসব ইচ্ছা ভালো না? এমন ইচ্ছা কারো প্রতি তোমার হয়নি কখনো? মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার দাবী চিরন্তন। তেমনি চিরন্তন হাত ধরার দাবী, একটু হেলে পড়ার দাবী। 
--আপনি, এমন কেন? সব কিছুতে জেতার এত ইচ্ছা কেন? 
-হা, হা, হা... এর মানে কি? 
--এর মানে হলো- দ্বিতীয় কি বর চাই, শুনি? 
-হা, হা, হা... সময় হলে চেয়ে নেবো। আজ বাই। 
-- বাই, ভালো থাকবেন। 
- কথা দিচ্ছি না। বাই। 

(চার)

-ঠক, ঠক, ঠক... কথার যাদুকর, আছেন? 
--আছি, কিন্তু আজ দরজা খোলা যাবেনা। 
-কেন? 
--একটা লেখার মাঝপথে আছি যে। 
- ও 
--মন খারাপ করছো কেন? দরজা খুলিনি ঠিক, কিন্তু জানালায় উঁকি দিয়ে তো কিছু কথা বললাম, নাকি? 
-হা, হা, হা... আচ্ছা ঠিক আছে। লিখেন তবে। পরে কথা হবে। টা টা 
--টা টা 

(পাঁচ) 

-ব্যস্ত নাকি যাদুকর? 
--ছিলাম না, এই হয়ে গেলাম। 
-এই হয়ে গেলাম মানে? কেমন করে ব্যস্ত হয়ে গেলেন? 
--তোমার সাথে কথা বলে। 
-সব সময় হেয়ালি, না? 
--না তো। তোমার ব্যাপারে সব সময় সিরিয়াস। আজ সারাদিন ধরে মনে হচ্ছিলো একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো তোমায়? 
-বলেন কি? কি সেই মহা মূল্যবান কথা? 
--তোমার কি অনেক লম্বা চুল? 
-হুম। কিন্তু কেন? লম্বা চুল দিয়ে কি হবে? 
-- লম্বা চুলের মালিককে জিজ্ঞাসা করবো, সে যেমন করে তার লম্বা চুলের যত্ন নেয় তেমন করে আর কারো কি যত্ন নেয়? 
- জেনে কি হবে? 
--সেই জানার গল্পটা যদি খুব সুন্দর হয়- তবে গল্প লেখা হবে। 
-ও আচ্ছা। আপনি তাহলে গল্প লেখার জন্য জানতে চাইছেন? আপনি তো খুব স্বার্থপর। 
--কে স্বার্থপর না, শুনি? 
-কেন? আমি। 
--এটা অবশ্য ভালো বলেছো। তুমি অবশ্য স্বার্থপর না। তুমি হলে স্বার্থ নিজ। হা, হা, হা... 
-তারমানে? 
--মানে খুব সোজা। নিজ স্বার্থে গল্প করতে এসেছো। হয়তো কোনো গভীর কস্ট ভুলতে, নয়তো কিছু থেকে লুকিয়ে থাকতে। 
-আপনার কেন তা মনে হলো? 
--মানুষ জন্মগত স্বভাবেই একা থাকতে চায় না। তোমার বয়সী একটা মেয়ে তো আরো না। 
- এতো বোঝেন? এ মুহুর্তে আর কি মনে হচ্ছে? 
--আর মনে হচ্ছে, তোমার মনটা আমি এখন খারাপ করে দিলাম। তাই, এখনি এ মনটা ভালো করে দিতে হবে। 
-আমার মন খারাপ হলে খুব সহজে ভালো হয়না। 
--তাইতো হওয়া উচিত। মন খারাপ হলে তা সহজে ভালো হবে কেন? মনের কি একটা ভাব আছে না? কথা নেই, বার্তা নেই সেই ভাব ভুলে কি ঠা ঠা করে হাসবে? 
-হা,হা,হা... হাসবোই তো। 
--হাসো তবে। চাঁদ অবাক হয়ে লাস্যময়ী তরুণীর হাসি উপভোগ করুক। 
-আর আপনি? 
--আমি এখন টা টা... পরে কথা হবে 
-হুম বাই। 

(ছয়) 

- কি করছিলেন? 
-- সুপ্রিয়া চ্যাটার্জিকে কোলে তুলে আদর করছিলাম। 
-যাহ্‌। কি যে বলেন? 
--সত্যি বলি। কোলে তুলে, কখনো আঙুলে স্পর্শ করে চোখ বুলিয়ে... । একে যদি আদর না বলে তবে কাকে বলে? 
- কে উনি? 
-- স্বনামধন্য লেখিকা। আমি তার গল্পের বইয়ের অন্ধ ভক্ত। 
- তাঁকে পেলেন কই? 
-- কেন? তাঁর লেখা গল্পের বইয়ে। 
-অদ্ভুত লোক আপনি। এভাবে ভাবতে আপনাকে কে শিখিয়েছে? নাকি নিজে থেকেই? 
--কোনো যাদুকর কি তার জাদু ফাঁস করে? 
-আচ্ছা ফাঁস না করেন, একটা জাদু দেখান। 
-- ... ... ... 
-ওমা, এই ডট ডট ডট এর মানে কি? 
--এর মানে হলো- তোমাকে আমি ডট ডট ডট দিয়ে একটা কথা লিখছি। যেটা এখন তোমার কাছে অদৃশ্য। কিন্তু একদিন ঠিক বুঝে যাবে। যতদিন বুঝতে পারছো না, ততদিন এটা তোমার কাছে এটা জাদু। 
-আপনি এত অদ্ভুত কেন? 
--আমি আর কি অদ্ভুত। তারচেয়ে বড় অদ্ভুত মানুষ তোমার সাথে থাকে। 
-আমার সাথে মানে? 
--আচ্ছা তোমার নাম একা কে রেখেছে? 
-কেন, আমার বাবা। 
--কোনো বাবা তাঁর সন্তানের নাম – ‘একা’ কি করে রাখে? কোনো বাবা কি চায়, তাঁর সন্তান একা থাকুক? এটা কি কম অদ্ভুত? 
- সে জন্যই কি আপনি আজ পর্যন্ত আমার নাম ধরে ডাকেন নি? 
--আমি বিশ্বাস করিনা তুমি একা। 
-কিন্তু আমি তো তাইই। 
--কোথাও ভুল হচ্ছে। 
-কোথাও ভুল হচ্ছেনা জাদুকর। 
--কিকরে? বলবে? 
-আজ না, অন্য একদিন। 
-- ঠিক আছে। আজ তাহলে বাই। 
- বাই জাদুকর। 

(সাত) 

-টুং টাং, টুং টাং 
--কি ব্যাপার, কলিংবেল কেন? দরজা তো খোলাই। 
-চ্যাট ঘরে এলাম, কি খাওয়াবেন? 
--কথার ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর চিপস। 
-হা, হা, হা... তেলে ভাজা আমার পছন্দ না। 
--তেল দিয়ে ভাজিনি তো, কথা দিয়েই ভাজলাম। 
-আপনি পারেনও। 
--শিখবে? 
-শেখাবেন? 
--মনের জোর আছে তো? 
-আপনার কি মনে হয়, নেই? 
--একা নামের মেয়ের কি, সেই মনের জোর থাকে? 
-হা, হা, হা... আপনি এখনো নাম নিয়ে আছেন? 
--তুমি নেই কেন বলবে? 
- আচ্ছা শুনুন তবে। আমার জন্মের সময় মায়ের অবস্থা খুব সঙ্গীন হয়ে উঠলো। ডাক্তার যখন বাবাকে জানালো- মা নয়তো বেবি যে কোনো একজনকে বাঁচানো যাবে। কার জন্য চেস্টা করবো? বাবা শুনে বোবা হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তারকে কিছুই নাকি বলতে পারেনি সেদিন। তারও কিছু পরে আমাকে বাবার হাতে তুলে দিয়ে ডাক্তার মাথা নীচু করে ফিসফিস করে বলেছিল, ওর মাকে বাঁচানো গেলো না, সরি। এক হাতে চোখ মুছতে মুছতে অন্য হাতে আমাকে কোলে তুলে বাবা বাসায় ফিরলো। আমার নাম রাখলো একা। তাঁর একা হাতেই মানুষ আমি। 
-- ওহো। আমি সত্যিই সরি, না জেনে তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। 
-আরে না, আপনি তো আর এতসব জানতেন না। 
--কিন্তু তবুও বলি, তুমি একা নও। তোমার বাবা ভুল নাম রেখেছে। আমি তোমার সাথে সারাদিন অনেক-অনেক কথা বলবো। তোমার মোবাইল নাম্বারটা দেবে, প্লিজ? 
-হা, হা, হা... আমার তো মোবাইল নাম্বার নেই। 
--মোবাইল নাম্বার দিতে চাচ্ছোনা, তাই বললেই হয়। 
-আপনি আমার কথা বিশ্বাস করছেন না? সত্যি আমার মোবাইল সেট নেই। আর দরকারও পড়ে না। 
--দরকার পড়ে না মানে? তোমার কোনো বন্ধু নেই? কারো সাথে কথা বলো না, তুমি? 
-বলি তো, সবার সাথেই বলি। তবে ইশারায়। আমি যে শব্দ করে কথা বলতে পারিনা। ইশারায় কথা বলতে মোবাইল লাগে বুঝি? 
-- কি বলছো এসব? 
- যে মেয়েটা শব্দ করে কথা বলতে পারে না, তার নাম ‘একা’ হওয়াটা কি খুব ভুল? তার অনেক বন্ধু না থাকাটা কি খুব অস্বাভাবিক? একা নামের মেয়েটা কি জন্ম থেকে একা জীবনের জলছাপ না? কী হলো কথার যাদুকর- কথা বলছেন না, কেন? 


সত্যজিৎ বিশ্বাস 
জন্ম: ১লা মার্চ, ১৯৭৪ 
কন্ট্রিবিউটর- স্যাটায়ার কার্টুন ম্যাগাজিন উন্মাদ। 
কন্ট্রিবিউটর- ফান ট্যাবলয়েড ‘ঠাট্টা’ (দৈনিক ইত্তেফাক) 
কন্ট্রিবিউটর- ফান ট্যাবলয়েড ‘প্যাঁচআল’ (দৈনিক সমকাল) 
কন্ট্রিবিউটর- ফান ট্যাবলয়েড ‘ঘোড়ার ডিম’ (দৈনিক কালের কন্ঠ) 
কন্ট্রিবিউটর- ফান ট্যাবলয়েড ‘বিচ্ছু’ (দৈনিক যুগান্তর) 

প্রকাশিত বইসমূহ: ভালবাসার অনেক রঙ (ছোটগল্প সমগ্র, শুদ্ধস্বর প্রকাশনী) 
জোকে জোঁকারণ্য (মৌলিক জোকস সমগ্র, নওরোজ কিতাবিস্তান) 
জলছাপ (ছোটগল্প সমগ্র, নওরোজ কিতাবিস্তান) 
রাম গরুড়ের ছানা হাসতে তাদের মানা (মৌলিক জোকস, প্রিয়মুখ প্রকাশন) 
ইরেজার ভূত (শিশুতোষ গল্প, প্রিয়মুখ প্রকাশন)
আমি পারবো (শিশুতোষ গল্প, ভিন্নচোখ প্রকাশনী) 
আমরা সবাই রাজা (শিশুতোষ গল্প, বিদ্যানন্দ প্রকাশনী)
শ্রেয়সীর ডাইরী (কিশোর উপন্যাস, শব্দভূমি প্রকাশনা) 
গল্পগুলো রম্য (রম্য গল্প সমগ্র, শব্দভূমি প্রকাশনা)